রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬ | ১১:৩৮:৪০ অপরাহ্ণ
আমার সাথে যুক্ত থাকুনXin

চারশো বছরের ঢাকা

ঢাকা ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই শহরে চোখে দেখার জিনিসের অভাব নেই, অভাব সময়ের হিসাবের। কারণ এখানে একই জমির ওপর জমে আছে অনেকগুলো যুগ। রাস্তার এক ধারে মোগল আমলের খিলান, তার গা ঘেঁষে ব্রিটিশ যুগের লাল ইটের ভবন, আর মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে মেট্রোরেলের লাইন। প্রশাসনিক মানচিত্রে ঢাকা একটি জেলা — আয়তনে ১,৪৬৩ দশমিক ৬০ বর্গকিলোমিটার, ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি সাতচল্লিশ লাখ, দেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ জেলা। কিন্তু এই সংখ্যাগুলো শহরটাকে চেনায় না। ঢাকাকে চিনতে হলে তার স্তরগুলো আলাদা করে দেখতে হয়, একটা একটা করে।

যাঁরা এই শহরে থাকি, আমরা জানি ঢাকার দুটি মুখ আছে। বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে পুরান ঢাকা — সরু গলি, পুরোনো দালান, শত বছরের পুরোনো খাবারের দোকান। আর নদী থেকে যত উত্তরে যাওয়া যায়, তত নতুন শহর — চওড়া রাস্তা, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি ভবন, আবাসিক এলাকা। দুটো মুখের মাঝখানে দূরত্ব খুব বেশি নয়, কিলোমিটারের হিসাবে বড়জোর দশ-বারো। ইতিহাসের হিসাবে চারশো বছর। এই লেখা সেই দুই মুখ ধরেই হাঁটবে।

ঐতিহ্য

“ঢাকা” নামটা কোথা থেকে এলো, এই প্রশ্নের সুনিশ্চিত উত্তর আজও নেই। এক মত অনুযায়ী নামটি এসেছে ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে — শহরের প্রাচীনতম মন্দিরগুলোর একটি, যার বর্তমান কাঠামোর অনেকটাই পরে গড়া হলেও নামটির সঙ্গে শহরের জন্মকথা জড়িয়ে গেছে। আরেক মত বলে, এককালে এ অঞ্চলে ঢাক গাছের (পলাশজাতীয় গাছ) বন ছিল, সেখান থেকেই নাম। তৃতীয় একটি ব্যাখ্যায় “ঢাক্কা” শব্দের অর্থ প্রহরাচৌকি বা গোপন চৌকি — নদীপথ পাহারা দেওয়ার ঘাঁটি হিসেবে জায়গাটার গুরুত্ব ছিল বলেই এমন নাম। ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ আছে, আর সেই মতভেদটাই আসলে বলে দেয়, ১৬১০ সালের অনেক আগে থেকেই এই জনপদের অস্তিত্ব ছিল।

সেই অস্তিত্বের প্রমাণও পাওয়া যায়। পর্তুগিজ ঐতিহাসিক জোয়াও দে বারোস ১৫৫০ সালের দিকে তাঁর মানচিত্রে ঢাকার অবস্থান চিহ্নিত করেছিলেন। আকবরনামায় ঢাকার উল্লেখ আছে থানা হিসেবে, আর আইন-ই-আকবরিতে এটি ছিল একটি পরগনা। অর্থাৎ মোগল রাজধানী হওয়ার আগেই ঢাকা ছিল নদীবাণিজ্যের পরিচিত ঠিকানা। ১৬১০ সালে সুবেদার ইসলাম খান চিশতি বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে সরিয়ে এখানে নিয়ে আসেন, আর সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামে শহরের নতুন নাম হয় জাহাঙ্গীরনগর। মজার ব্যাপার হলো, সরকারি কাগজে জাহাঙ্গীরনগর চললেও মানুষের মুখে “ঢাকা” নামটাই টিকে গেছে — বিদেশি পর্যটক আর কোম্পানির কর্মকর্তারাও চিঠিপত্রে ঢাকাই লিখতেন।

রাজধানী হওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে ভূগোলের ভূমিকা ছিল বড়। পুরান ঢাকা গড়ে উঠেছে বুড়িগঙ্গার উত্তর পাড়ের উঁচু জমিতে — দক্ষিণে নদী, আর জেলাটিকে প্রায় ঘিরে আছে তুরাগ, বালু, বংশী আর ধলেশ্বরী। নৌপথই ছিল তখনকার মহাসড়ক; রাজধানীর জন্য এমন জায়গাই দরকার ছিল, যেখান থেকে নদী ধরে পুরো বাংলায় পৌঁছানো যায়, আবার শত্রুর আক্রমণ ঠেকানোও সহজ হয়। উত্তরের জমি তুলনামূলক উঁচু, পুরোনো মধুপুর গড়ের ধার ঘেঁষে — বন্যার পানি প্রতি বছর শহরের পুরোনো অংশটাকে ছুঁতে পারত না বলেই বসতি টিকে ছিল। এই নদী-ঘেরা অবস্থান পরের চারশো বছর ধরে শহরের ভাগ্য নির্ধারণ করে গেছে: বাণিজ্যের প্রসারও নদী ধরে, আবার আধুনিক যুগে এসে শহরের বাড়তি জমির সংকটও সেই নদী আর জলাশয় ভরাটের দিকেই ঠেলে দিয়েছে।

রাজধানী হওয়ার পরের শতাব্দীটা ঢাকার বিস্তারের সময়। প্রশাসনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ল বাণিজ্য, আর সেই বাণিজ্যের কেন্দ্রে ছিল মসলিন। এত সূক্ষ্ম সুতোয় বোনা হতো এই কাপড় যে, গোটা একখানা শাড়ি আংটির ভেতর দিয়ে গলিয়ে দেওয়া যেত — কথাটা কিংবদন্তির সুরে শোনা গেলেও, ইউরোপ ও পারস্যের বণিকদের ঢাকার ঘাটে ভিড় করার পেছনে এই বস্ত্রের ভূমিকা ছিল বাস্তব। তাঁতি, রংরেজ, সুতো-কাটুনি — বহু মানুষের জীবিকা ঘুরত এই শিল্পকে ঘিরে। নবাবি আমলে শহর পেল নতুন প্রাসাদ আর মসজিদ; বড় কাটরার মতো সরাইখানা গড়ে উঠল নদীর পাড়ে। তারপর আঠারো শতকে রাজধানী মুর্শিদাবাদে সরে গেলে ঢাকার জৌলুস কমতে থাকে, মসলিনের বাজারও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।

ব্রিটিশ আমলে শহরটা আবার রূপ বদলায়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকা হয় পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী — মাত্র কয়েক বছরের জন্য হলেও সেই সময়ে গড়ে ওঠে কার্জন হলের মতো ভবন, প্রশাসনিক কোয়ার্টার আর নতুন সড়ক। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যা পরের দশকগুলোতে এই শহরের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলনের শহীদ মিনার এই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা ছিল ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে, আর ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে — আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে — স্বাক্ষরিত হয় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল। মোগল রাজধানী থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানী — চারশো বছরে শহরটা বারবার ভেঙেছে, বারবার গড়েছে নিজেকে।

দর্শনীয় স্থান

ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখার যাত্রা শুরু করা যায় লালবাগ কেল্লা দিয়ে। ১৬৭৮ সালে মোগল সুবেদার যুবরাজ মুহাম্মদ আজম শাহ কেল্লার নির্মাণ শুরু করেন। দিল্লি থেকে ডাক পড়ায় তাঁকে মাঝপথে ফিরে যেতে হয়; দায়িত্ব পান পরের সুবেদার শায়েস্তা খাঁ। ১৬৮৪ সালে তাঁর মেয়ে ইরান দুখত, যাঁকে সবাই পরী বিবি নামে চেনে, হঠাৎ মারা যান। কথিত আছে, মেয়ের মৃত্যুর পর শায়েস্তা খাঁ কেল্লাটিকে অপয়া মনে করে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন — কেল্লাটা তাই আজও অসমাপ্ত। প্রাঙ্গণের মাঝখানে পরী বিবির সমাধি, সাদা মার্বেল আর কালো ব্যাসল্ট পাথরে গড়া; পাশে দিওয়ান-ই-আম আর তিন গম্বুজের মসজিদ। দেয়ালের বাইরে আজকের ঘনবসতি শহর, ভেতরে অবাক করা শান্ত একটা বাগান — এই বৈপরীত্যটাই লালবাগের প্রথম ধাক্কা। কেল্লার সুড়ঙ্গ নিয়ে যে গল্প শোনা যায়, তার প্রমাণিত ভিত্তি নেই; তবে ভূগর্ভস্থ কক্ষ আর গুপ্ত পথের অংশবিশেষ খননে পাওয়া গেছে, যা কৌতূহলটা বাঁচিয়ে রেখেছে।

লালবাগ থেকে রিকশায় মিনিট পনেরোর পথ বকশীবাজারের হোসনি দালান। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এটি উপমহাদেশের প্রাচীনতম ইমামবাড়াগুলোর একটি — ১৬৪২ সালে শাহ সুজার শাসনামলে নৌবহরের কর্মকর্তা মীর মুরাদ এটি নির্মাণ করেন। শিয়া মুসলমানদের ধর্মীয় কেন্দ্র এই দালান মহররমে রূপ বদলায়; আশুরার দিন এখান থেকে বের হয় তাজিয়া মিছিল, যা দেখতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষও ভিড় করেন। প্রাঙ্গণে একটি পুরোনো পুকুর আছে, আর ভবনটির গায়ে দুই যুগের স্থাপত্যের ছাপ — ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরে নবাব আহসানউল্লাহ সংস্কার করিয়েছিলেন।

নদীর দিকে এগোলে চকবাজারের বড় কাটরা। ১৬৪৪ থেকে ১৬৪৬ সালের মধ্যে শাহ সুজার আমলে নির্মিত এই সরাইখানা একসময় ছিল বণিক আর পর্যটকদের রাত্রিযাপনের জায়গা; মূল ভবনের বড় অংশ হারিয়ে গেলেও দক্ষিণের বিশাল তোরণটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। কাছেই শায়েস্তা খাঁর আমলে গড়া ছোট কাটরা। দুটোই আজ চারপাশের দোকানপাট আর বসতির ভিড়ে প্রায় ঢাকা পড়েছে — খুঁজে বের করতে হয় বলে আবিষ্কারের আনন্দটাও বেশি।

কাটরা থেকে সদরঘাটের পথে আহসান মঞ্জিল, বুড়িগঙ্গার পাড়ে গোলাপি রঙের প্রাসাদ। ১৮৫৯ সালে নবাব খাজা আবদুল গনি এর নির্মাণ শুরু করেন, শেষ হয় ১৮৭২ সালে; নাম রাখেন ছেলে খাজা আহসানউল্লাহর নামে। একসময় এর গম্বুজই ছিল ঢাকার সবচেয়ে উঁচু কাঠামো। বাসভবনের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাসাদটি রাজনীতির মঞ্চও হয়েছিল — ১৯০৬ সালে এখানকার এক বৈঠকেই মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। এখন এটি জাতীয় জাদুঘরের অধীনে একটি জাদুঘর; ভেতরে নবাবি আমলের আসবাব, তৈজসপত্র, ছবি আর দরবার কক্ষ দেখে সেই যুগের জীবনযাপনের একটা ধারণা পাওয়া যায়। প্রাসাদের সামনের সিঁড়িতে দাঁড়ালে সামনে নদী — লঞ্চ, ট্রলার আর খেয়া নৌকার অনবরত যাতায়াত।

আহসান মঞ্জিল থেকে হাঁটাপথে আরমানিটোলা। মহল্লাটার নামই এসেছে আর্মেনীয় বসতি থেকে। ১৭৮১ সালে নির্মিত আর্মেনিয়ান চার্চ — পবিত্র পুনরুত্থান গির্জা — এখনো দাঁড়িয়ে আছে; প্রাঙ্গণে রয়েছে প্রায় দুই শ আর্মেনীয়ের সমাধি। একসময় ঢাকার বাণিজ্যে প্রভাবশালী এই সম্প্রদায় আজ প্রায় নেই বললেই চলে, গির্জাটিই তাদের উপস্থিতির শেষ বড় চিহ্ন। গির্জার কাছেই তারা মসজিদ। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে মির্জা গোলাম পীর এটি নির্মাণ করেন সাধারণ রীতিতে; তবে মসজিদটির আজকের চেহারা ১৯২৬ সালের, যখন স্থানীয় ব্যবসায়ী আলী জান বেপারী পুরো ভবনটি সাজিয়ে দেন চিনিটিকরির কাজে — ভাঙা চিনামাটির বাসনের টুকরো দিয়ে তৈরি মোজাইকে নীল তারার নকশা, সেই থেকে নাম তারা মসজিদ। ১৯৮৭ সালে সম্প্রসারণে গম্বুজ তিনটি থেকে পাঁচটি হয়। ভেতরের দেয়ালে জাপানের ফুজি পাহাড়ের ছবি পর্যন্ত আছে — আমদানি করা টালির যুগে কারিগরদের হাতে বিশ্বটা ঢুকে পড়েছিল একটা মহল্লার মসজিদে।

পুরান ঢাকার আরেক প্রান্তে টিকাটুলির রোজ গার্ডেন প্রাসাদ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এক হিন্দু জমিদার পরিবারের গড়া এই বাড়ি ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে একটি তারিখ দিয়ে — ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ। বাড়িটির সাদা স্তম্ভ আর বাগানঘেরা প্রাঙ্গণ সেই যুগের ঢাকার ঐশ্বর্যের কথা বলে। আরেকটু এগিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা — ১৯০৪ সালে নির্মিত কার্জন হলের লাল ইট আর ইন্দো-সারাসেনিক নকশা, গাছে ঢাকা পুরোনো ভবন, আর পাশেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের খোলা মাঠ। বিকেলের দিকে এই এলাকাটা শহরের সবচেয়ে শান্ত জায়গাগুলোর একটি। স্থাপত্যে আগ্রহ থাকলে আগারগাঁওয়ের জাতীয় সংসদ ভবন দেখা যায় বাইরে থেকে — স্থপতি লুই আই কানের নকশা করা এই ভবনকে আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে ধরা হয়, যদিও ভেতরে ঢোকা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য সীমাবদ্ধ।

এসব স্থাপনার ফাঁকে ফাঁকে পুরান ঢাকার আসল জাদুঘর আসলে তার গলিগুলো। শাঁখারীবাজারের সরু পথের দুই ধারে শঙ্খের কারিগরদের দোকান — শাঁখা কাটা আর নকশা তোলার কাজ চলে আসছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তাঁতিবাজারে তাঁতিদের পুরোনো বসতি, বংশাল আর নারিন্দার গলিতে উনবিংশ শতকের দালানগুলো গায়ে গায়ে লেগে আছে। নামকরণের আলোচনায় যে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কথা আসে, সেটি লালবাগ এলাকাতেই; ঐতিহ্য অনুযায়ী এর প্রতিষ্ঠা সেন যুগে, যদিও বর্তমান কাঠামোর বড় অংশ পরের সংস্কার। এই মহল্লাগুলোতে ঘোরার মজা এখানেই — পরিকল্পনা করে সব দেখা যায় না, হাঁটতে হাঁটতেই কোনো পুরোনো মন্দিরের তোরণ বা একটা জীর্ণ খিলান হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ায়।

শহরের উত্তরের অংশে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর — ১৯১৩ সালে যাত্রা শুরু করা ঢাকা জাদুঘরের উত্তরসূরি এই প্রতিষ্ঠানে জেলার নয়, গোটা দেশের ইতিহাস সাজানো: ভাস্কর্য, পাণ্ডুলিপি, মুদ্রা, লোকশিল্প। ঢাকার বাইরে থেকে আসা কারো জন্য পুরান ঢাকা ঘোরার আগে বা পরে এই জাদুঘরে এক-দেড় ঘণ্টা কাটালে শহরটার টুকরো টুকরো ইতিহাস একটা ধারাবাহিকতায় দাঁড়িয়ে যায়।

জেলার মানচিত্রে মহানগরের বাইরেও যে আলাদা একটা জীবন আছে, তা টের পাওয়া যায় ধামরাই গেলে। শহর থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এই উপজেলা শহর পরিচিত দুটি কারণে। এক, শ্রী শ্রী যশোমাধবের রথযাত্রা — রথের সময় এখানে মাসব্যাপী মেলা বসে, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। দুই, কাঁসা-পিতলের কারুশিল্প। বহু প্রজন্ম ধরে এখানকার কারিগরেরা মোমের ছাঁচ গলিয়ে ধাতু ঢালাইয়ের প্রাচীন পদ্ধতিতে মূর্তি আর তৈজসপত্র বানিয়ে আসছেন। একসময় শতাধিক কারখানা ছিল ধামরাইয়ে, এখন টিকে আছে হাতেগোনা কয়েকটি — তবু রথখোলা এলাকার দোকানগুলোতে গেলে কারিগরদের কাজ কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে। একই দিকে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ — স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেনের নকশায় সাত জোড়া ত্রিভুজাকার স্তম্ভ ধাপে ধাপে উঠে গেছে দেড়শো ফুট উঁচুতে, মুক্তিযুদ্ধের সাতটি পর্বের প্রতীক হিসেবে। ঢাকা ভ্রমণে হাতে একটা বাড়তি দিন থাকলে এই দুটি জায়গা একই যাত্রায় ঘুরে আসা যায়।

যাতায়াত

দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ঢাকায় আসার পথ একাধিক। আকাশপথে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শহরের উত্তর প্রান্তে। রেলপথে কমলাপুর স্টেশন থেকে দেশের প্রায় সব বড় শহরের ট্রেন চলে। দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের পুরোনো মাধ্যম সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল — বরিশাল, ভোলা, চাঁদপুরের লঞ্চগুলো এখনো প্রতিদিন ভোরে আর সন্ধ্যায় ছাড়ে। সড়কপথে সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী — তিনটি বড় আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল।

শহরের ভেতরে চলাচলের ছবিটা বদলে দিয়েছে মেট্রোরেল। ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত প্রথম অংশ চালু হয়, ২০২৩ সালের নভেম্বরে লাইনটি পৌঁছায় মতিঝিল পর্যন্ত। যানজটের শহরে প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিটে উত্তরার এক প্রান্ত থেকে শহরের বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পৌঁছানো এখন সাধারণ অভিজ্ঞতা। তবে পুরান ঢাকায় মেট্রো যায় না; সেখানে রাজত্ব রিকশার। ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্র ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কোর মানবতার অস্পৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে — বলা হয়েছে, এই রঙিন চিত্রকলা শহরটির পরিচয়ের অংশ। রিকশার হুড আর পেছনের পাতে আঁকা ছবিগুলো — সিনেমার নায়ক, ময়ূর, গ্রামের দৃশ্য — আসলে চলমান একটা লোকজ গ্যালারি।

পুরান ঢাকা ঘোরার সবচেয়ে ভালো উপায় হাঁটা। গলিগুলো এত সরু যে অনেক জায়গায় গাড়ি ঢোকে না, আর দেখার জিনিসগুলো — কাটরা, মসজিদ, পুরোনো বাড়ি — একে অপরের হাঁটাপথের দূরত্বে। সদরঘাট থেকে খেয়া নৌকায় বুড়িগঙ্গা পার হয়ে কেরানীগঞ্জের দিকে যাওয়াটাও অভিজ্ঞতার অংশ; নদী থেকে শহরের যে দৃশ্য দেখা যায়, পাড় থেকে তা দেখা যায় না। সত্যি কথাটা এখানে বলা দরকার — বুড়িগঙ্গার পানি এখন আর সেই নদীর পানি নয়, যার টানে একদিন রাজধানী এখানে এসেছিল। শিল্পবর্জ্য আর দখলে নদীটি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ; সংবাদমাধ্যমে এর দূষণ নিয়ে প্রতিবেদন নিয়মিতই আসে। তবু এই নদী মরে যায়নি — প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ খেয়া পার হয়, লঞ্চ ছাড়ে, মাঝিরা জীবিকা চালান এর ওপর ভর করেই। ভ্রমণকারীর চোখে এই বৈপরীত্যটাও ঢাকার পরিচয়ের অংশ। সময়ের কথা বললে, পুরান ঢাকার জন্য সকালটা সুবিধাজনক — দোকানপাট খুলতে শুরু করে, ভিড় তখনো পুরোপুরি জমেনি। আর ভ্রমণের ঋতু হিসেবে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি স্বস্তিদায়ক; এই সময়েই পৌষ সংক্রান্তিতে সাকরাইন উৎসবে শাঁখারীবাজার-তাঁতিবাজারের আকাশ ভরে যায় ঘুড়িতে। রমজান মাসে গেলে চকবাজারের ইফতার বাজারের অভিজ্ঞতা আলাদা করে রাখা যায়, তবে ভিড়ের জন্য মানসিক প্রস্তুতি থাকা ভালো।

প্রসিদ্ধ খাবার

পুরান ঢাকার খাবারের কথা শুরু হয় বিরিয়ানি দিয়ে। নাজিরাবাজারের হাজী বিরিয়ানি — ১৯৩৯ সালে হাজী মোহাম্মদ হোসেন পথের ধারের ছোট দোকান হিসেবে শুরু করেছিলেন, এখন তাঁর নাতি হাজী মোহাম্মদ শাহেদের প্রজন্ম চালাচ্ছেন। খাসির মাংসের এই বিরিয়ানি রান্না হয় সরিষার তেলে, সঙ্গে বোরহানি — দই আর পুদিনার টক-ঝাল পানীয়, যা ভারী খাবারের সঙ্গে এ অঞ্চলের নিজস্ব জুটি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানটি নিজে থেকে বলে, রেসিপিতে প্রতিষ্ঠাতার আমল থেকে কোনো বদল আনা হয়নি। একই মহল্লায় তেহারি আর মোরগ পোলাওয়ের পুরোনো দোকানও কম নয়; বিয়েবাড়ির খাবারের যে ঢাকাইয়া ধরন, তার শিকড় এই মহল্লাগুলোতেই।

সকালের নাশতায় বাকরখানি। চাপাটি-জাতীয় এই শুকনো রুটির ইতিহাস মোগল আমল পর্যন্ত টানা হয়; নামকরণ নিয়ে প্রচলিত গল্পে আছে আগা বাকর খাঁ আর খানি বেগমের নাম — সেটি লোককথা হিসেবেই শোনা ভালো। ঘন দুধের চা দিয়ে বাকরখানি পুরান ঢাকার বহু মানুষের দিনের শুরু আজও। দুপুরের পর থেকে ভিড় বাড়ে বিউটি লাচ্ছিতে। ১৯২২ সালে আবদুল আজিজ জনসন রোডে লেবুর শরবতের দোকান হিসেবে শুরু করেছিলেন; এক শতাব্দী পেরিয়েও লাচ্ছি আর ফালুদার জন্য দোকানটার নাম শহরজুড়ে।

ঢাকাইয়া খাবারের আলাদা একটা দিকে নজর দেওয়া যায় — এই রান্নাঘর গড়ে উঠেছে মোগল দরবারি রুচি আর স্থানীয় বাঙালি উপকরণের মিলনে। কাচ্চি বিরিয়ানিতে কাঁচা মাংস আর চাল একসঙ্গে দমে রান্না হয়, মোরগ পোলাওয়ে ঘি আর মোরগের স্বাদটাই প্রধান, তেহারিতে সরিষার তেলের ঝাঁঝ। বিয়ের অনুষ্ঠানে এই পদগুলো এখনো পুরান ঢাকার বাবুর্চিদের হাতেই রান্না হয় অনেক বাড়িতে — পরিবারগুলোর পুরোনো বাবুর্চি বংশানুক্রমে অন্য পরিবারের অনুষ্ঠানে রাঁধেন, এমন চলও আছে। ফলে এই খাবারগুলো রেস্তোরাঁর মেন্যু কার্ডের বিষয় মাত্র নয়; মহল্লার সামাজিক জীবনের সঙ্গে সেগুলো বাঁধা। কোন বাড়ির বিয়েতে কোন বাবুর্চি রাঁধলেন, তা নিয়ে আলোচনা হয় আত্মীয়দের মধ্যে — স্বাদের এই মানচিত্রটা বই পড়ে বোঝা যায় না, খেতে খেতেই হয়।

মিষ্টি আর হালকা খাবারে চকবাজারের শাহী জিলাপি, ফিরনি আর হালিমের নাম আসে। রমজান এলে এই বাজারটা পুরো বদলে যায় — শত বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসা ইফতার বাজারে বিরিয়ানি থেকে শুরু করে জিলাপির পাশাপাশি এমন সব পদ সাজানো থাকে, যেগুলোর অনেকগুলোই রমজান ছাড়া সারা বছর পাওয়া যায় না। চকবাজারের ইফতার বাজার দেখাটাও পুরান ঢাকার সামাজিক জীবনের একটা অভিজ্ঞতা — কেনাবেচার ভিড়ের মধ্যে দিয়ে ইফতারের আগের এক ঘণ্টা শহরটার আরেকটা চরিত্র ফুটে ওঠে।

দিন শেষে আবার নদীর পাড়। সন্ধ্যায় সদরঘাটে সারি ধরে লঞ্চ ছাড়ে দক্ষিণের পথে; ডেকের আলো জলে ভেঙে ভেঙে পড়ে। চারশো বছর আগে এই ঘাটে ভিড়ত বণিকের নৌকা, আজ ভিড়ে যাত্রীর লঞ্চ — জায়গাটা একই আছে, কাজটা বদলেছে। ঢাকা নিয়ে অভিযোগের তালিকা লম্বা, তা থাকবেই। কিন্তু এই শহরে প্রতিটা যুগ তার ছাপ রেখে গেছে পরের যুগের গায়ে, আর সেই স্তরগুলো একসঙ্গে দেখা যায় এমন শহর দেশে আর একটিও নেই।

শেয়ার করুন:ftinX