শেষ বাসের যাত্রী

রাত এগারোটা চল্লিশে বাসটা ছাড়ল। দিনের শেষ বাস। ভেতরে যাত্রী মোট পাঁচজন, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসা। বাসের দুটো টিউবলাইটের একটা নেভা, আরেকটা মাঝে মাঝে কাঁপে। সেই কাঁপা আলোয় সবার মুখ একবার দেখা যায়, একবার আধো অন্ধকারে হারিয়ে যায়। বাইরে রাস্তা প্রায় ফাঁকা। বন্ধ দোকানের শাটারে হেডলাইটের আলো পড়ে আবার সরে যাচ্ছে। জানালার কাঁচে জমে আছে হালকা বাষ্প, তার ভেতর দিয়ে শহরটা ঝাপসা।
কন্ডাক্টর দরজার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, এক হাতে নোটের গোছা, অন্য হাতে দড়ি বাঁধা হাতল। মাঝে মাঝে তিনি বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চেনা মোড়গুলোর নাম হাঁকেন, যদিও নামবার লোক প্রায় কেউ নেই। বাসের ভেতর ডিজেলের গন্ধের সঙ্গে পুরনো গদির একটা ভাপসা গন্ধ মিশে আছে। আমার ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেছে অনেক আগে। করার কিছু না থাকলে মানুষ চারদিকে তাকাতে শেখে। আমিও তাকাচ্ছিলাম।
আমি বসেছিলাম মাঝামাঝি একটা সিটে, জানালার ধারে। আমার সামনের সিটে পঞ্চাশ উর্ধ্বে বয়সের একজন বুড়ো মানুষ। গায়ে ধোয়া-ওঠা সাদা পাঞ্জাবি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। কোলের ওপর হাতে-বোনা থলে, থলের মুখ শক্ত করে ধরে আছেন। একটু পরপর তাঁর মাথাটা ঝুঁকে আসে ঘুমে, আবার ঝটকা খেয়ে সোজা হয়। জেগে উঠলেই তিনি বুকের ভেতরের পকেটে একবার হাত বুলিয়ে নেন। কোনো কিছু বারবার ছুঁয়ে নিশ্চিত হওয়ার অভ্যাস মানুষের অনেক দিনের জমে, আমি জানি। আমার বাবারও ছিল।
একবার তিনি আমার দিকে ফিরলেন। ‘‘বাবা, কটা বাজে?’’
‘‘এগারোটা পঞ্চাশ, চাচা।’’
‘‘মোড়টা আসতে দেরি আছে?’’
‘‘না, দুইটা স্টপেজ পরেই।’’
তিনি ঘাড় নেড়ে আবার সামনে ফিরলেন। একটু পর থলের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটা ছোট ওষুধের শিশি বের করে দেখলেন, তারপর সেটা আবার গুছিয়ে রাখলেন। তাঁর তাড়া ছিল কোথাও পৌঁছানোর, সেটা বোঝা যাচ্ছিল ঘন ঘন ঘড়ি-খোঁজা দেখে। যদিও ঘড়ি বলতে তাঁর হাতে কিছুই ছিল না।
বাসের অন্য পাশের সারিতে, বসেছিল একটি ছেলে। বয়স তেইশ-চব্বিশের বেশি হবে না। গায়ে রং-জ্বলা শার্ট, বোতামের একটা নেই বলে কলারের কাছটা ভাঁজ হয়ে আছে। পায়ে স্যান্ডেল—এক পাটির ফিতা ছেঁড়া, তার দিয়ে বাঁধা। কন্ডাক্টর ভাড়া চাইতে এলে সে অনেকক্ষণ ধরে প্যান্টের পকেট হাতড়াল। বের হলো ভাঁজ-পড়া একটা বিশ টাকার নোট আর কয়েকটা খুচরো পয়সা। গুনে গুনে ভাড়া মেটাল, তারপর খুচরোগুলো আবার পকেটে রেখে জানালার দিকে মুখ ফেরাল। একটু পরেই তার মাথাটাও কাঁচে ঠেকে গেল। কাজ শেষে ফেরা মানুষের ঘুম যেমন হয়—ভারী, নিশ্চিন্ত।
মাঝপথে দুজন যাত্রী নেমে গেল। রইলাম আমরা তিনজন। ফুটপাতে এক সারি মানুষ ঘুমিয়ে, তাদের গায়ে মলিন চাদর, পাশে বাঁধা পুঁটলি। বাসের জানালা দিয়েই এই শহরটা অন্য রকম দেখায় রাতের বেলায়—দিনের হইচই নেই, তাড়াহুড়ো নেই, আলোগুলোও মনে হয় ক্লান্ত। বুড়ো মানুষটা তখন জেগে। তিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন, ঠোঁট নড়ছে অল্প অল্প, যেন মনে মনে কিছু গুনছেন, কিংবা কারও নাম নিচ্ছেন। ছেলেটা তখনও ঘুমে।
বাসের ইঞ্জিনের একটানা শব্দ, মাঝে মাঝে ব্রেকের চিৎকার। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো এবার অনেক দূরে দূরে। হঠাৎ কন্ডাক্টর গলার স্বরে ডাক দিলেন, ‘‘চাচা, মোড় এসে গেছে। নামবেন না?’’ বুড়ো মানুষটা ধড়মড় করে উঠলেন। থলে হাতে নিয়ে, চশমা ঠিক করতে করতে প্রায় ছুটে দরজার দিকে গেলেন। বাসটা পুরো থামার আগেই তিনি নেমে গেলেন রাস্তার অন্ধকার ধারে।
বাস আবার চলতে শুরু করার পর আমার চোখ গেল তাঁর সিটের দিকে। সিটের কিনারায়, গদির ভাঁজের পাশে কালো মতো একটা জিনিস। ঝুঁকে দেখি—মানিব্যাগ। পুরনো চামড়ার, কোণাগুলো ক্ষয়ে সাদা হয়ে এসেছে। হয়তো পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিটে পড়ে গিয়েছিল, নামার তাড়ায় টের পাননি। আমি মুখ খুলতে যাব, ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের সারি থেকে একটা হাত এগিয়ে এল। তাকিয়ে দেখি, ছেলেটার ঘুম ভেঙেছে। সেও মানিব্যাগটা দেখতে পেয়েছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে হাত বাড়িয়ে মানিব্যাগটা তুলে নিল।
আমি আর কিছু বললাম না। দেখতে লাগলাম। ছেলেটা মানিব্যাগটা খুলল। ভেতরে ভাঁজ করা নোটের একটা গোছা—দূর থেকে মনে হলো, টাকার অঙ্ক কম নয়। তার পাশে ভাঁজ করা একটা কাগজ, প্রেসক্রিপশনের মতো। ছেলেটার বুড়ো আঙুল নোটের গোছার ওপর একবার থামল। বাসের আলোটা তখনই কেঁপে উঠল একবার। তার মুখটা আধো আলোয়, আধো অন্ধকারে। পাশে তারই ছেঁড়া স্যান্ডেলজোড়া, পকেটে ফিরে যাওয়া খুচরো কয়েকটা পয়সা। আমি দম আটকে বসে রইলাম। অনেক বছর আগে আমিও একবার বাসে মানিব্যাগ হারিয়েছিলাম। তখন পড়ি কলেজে, ভেতরে ছিল বাবার পাঠানো মাসের খরচ আর আমার ছবি-লাগানো একটা আইডি কার্ড। দুই দিন ধরে স্ট্যান্ডে গিয়ে খোঁজ করেছিলাম। পায়নি। ওই দুই দিনের কথা আমার এখনও মনে পড়ে, কার্ডটার জন্য বেশি, টাকাটার জন্য কম। এই ছেলেটার বুড়ো আঙুল নোটের গোছার ওপর থেমে আছে, আর আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন সেই দুই দিনের ভেতরে আবার ফিরে গেছি। হয়তো সে টাকাটা রাখবে। রাখাটা তার জন্য কঠিন কিছু ছিল না—সিটে পড়ে থাকা জিনিস, কেউ দেখেনি, আমিও হয়তো মুখ ফিরিয়ে নিতাম একটু পর।
কিন্তু ছেলেটা উঠে দাঁড়াল। সিটের হাতল ধরে টলতে টলতে এগিয়ে গেল সামনের দিকে।
‘‘ভাই, বাস থামান। একটু থামান,’’ সে কন্ডাক্টরকে বলল।
‘‘কী হইল? নামবা নাকি? তোমার স্টপেজ তো আরও সামনে।’’
‘‘ওই চাচা মানিব্যাগ ফেলে গেছে। সিটে পড়ে ছিল।’’
কন্ডাক্টর বিরক্ত হলেন। ‘‘আরে ধুর, গাড়ি এখন ঘোরাব কেমনে! শেষ বাস, টাইম আছে নাকি! কাল কাউন্টারে জমা দিও।’’
ছেলেটা গলা নামাল না। ‘‘প্রেসক্রিপশন আছে ভেতরে। থামান ভাই, আমি দৌড়ায়া দিয়া আসতেছি।’’
ড্রাইভার পেছন ফিরে একবার তাকালেন। তারপর কিছু না বলে, মোড়টা পেরিয়ে বাসটা রাস্তার ধারে ভেড়ালেন। দরজা খুলতেই ছেলেটা লাফ দিয়ে নেমে গেল।
বাসটা দাঁড়িয়ে রইল ইঞ্জিন চালু রেখে। কন্ডাক্টর দরজা ধরে ঝুঁকে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। আমিও কৌতুহল নিয়ে তার পিছনে ছুটলাম। রাস্তার ওপাশের দোকানগুলো সব বন্ধ, শুধু অনেক দূরে একটা চায়ের দোকানে তখনও আলো, ধোঁয়া উঠছে কেটলি থেকে।
সে দৌড়াচ্ছে। তার দিয়ে বাঁধা স্যান্ডেলের শব্দ রাতের ফাঁকা রাস্তায় স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল—ঠপ্ ঠপ্। দূরে, বন্ধ একটা দোকানের চালার নিচে বুড়ো মানুষটা দাঁড়িয়ে। থলে নামিয়ে রেখে তিনি দুই হাতে পাঞ্জাবির পকেট হাতড়াচ্ছেন, বুকের পকেট, পাশের পকেট, আবার বুকের পকেট। জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি আধপাক ঘুরে গেলেন একবার।
ছেলেটা পৌঁছে মানিব্যাগটা বাড়িয়ে ধরল। বুড়ো মানুষটা প্রথমে এক মুহূর্ত বোঝেননি, তারপর দুই হাতে মানিব্যাগটা চেপে ধরলেন বুকের কাছে। খুলে দেখলেন। তিনি ছেলেটার হাত ধরে টানলেন, একটা নোট বের করে গুঁজে দিতে চাইলেন তার হাতে।
কথাগুলো আমার কাছে হাওয়ায় ভেঙে ভেঙে আসছিল। শুধু শেষ কথাটা স্পষ্ট শুনলাম। ছেলেটা এক পা পিছিয়ে গিয়ে বলল, ‘‘না চাচা। আপনি টাকাটা একবার গুনে দেখেন, সব ঠিক আছে কিনা।’’
বুড়ো মানুষটা রাস্তার আলোর নিচে দাঁড়িয়ে নোটগুলো গুনলেন। তারপর মাথা তুলে কিছু একটা বললেন, ছেলেটা হাসল শুধু। ফিরতি দৌড়ে সে যখন বাসের দরজায় উঠল, তার শার্টের পিঠ ঘামে ভিজে গেছে, নিশ্বাস ভারী। ড্রাইভার একবার ছোট করে হর্ন দিলেন, যেন তাড়া দিয়ে ডাকলেন। কন্ডাক্টর কিছু বললেন না আর।
ছেলেটা নিজের সিটে ফিরে বসল।
আমি পানির বোতলটা এগিয়ে দিলাম, সে মাথা নেড়ে না করল, ‘‘লাগবে না ভাই।’’ বলেই জানালার কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে দিল। বাস চলতে চলতে কখন যেন তার চোখ আবার বুজে গেল। আমি তার নামটাও জিজ্ঞেস করতে পারলাম না এবার। ঘুমন্ত মানুষটাকে ডাকতে কেমন একটা সংকোচ হলো—হয়তো নাম জানার দরকারও ছিল না।


