বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ১১:৩৫:৪৫ অপরাহ্ণ
আমার সাথে যুক্ত থাকুনXin

মহাকাশে লেখা হাইকু

রাতের দিকে ফোনটা হাতে নিয়ে খবরটা পড়লাম, আর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। গুগলের একটা স্যাটেলাইট মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে একটা কবিতা পাঠিয়েছে। তিন লাইনের হাইকু। লেখক কোনো মানুষ নয় — স্যাটেলাইটের ভেতরে বসানো একটা চিপে চলা এআই মডেল।

কবিতাটা এই রকম:

Blue marble below
Data streams in silent grace
Starlight feeds my core.

নিচে নীল মার্বেলের মতো পৃথিবী, নীরবে বয়ে চলা ডেটা, আর তার ভেতরটা ভরে আছে তারার আলোয়। কথাগুলো খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু যে জায়গা থেকে কথাগুলো এলো, সেটাই খবর। এর আগে ডেটা সেন্টারের চিপ মহাকাশে উঠে এভাবে উত্তর দেয়নি — অন্তত গুগলের ভাষায়, এটাই প্রথমবার।

ঘটনাটা ঘটেছে ৩০ অক্টোবর, ২০২৬। গুগলের নিজের ব্লগে জানানো হয়েছে, তাদের প্রজেক্ট সানক্যাচারের পরীক্ষামূলক স্যাটেলাইট থেকে এই উত্তর এসেছে। স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ হয়েছিল ১ অক্টোবর, স্পেসএক্সের ট্রান্সপোর্টার-১৮ মিশনে, স্যাটেলাইট কোম্পানি প্ল্যানেটের তৈরি মহাকাশযানে চড়ে। তারপর কয়েক সপ্তাহ ধরে চলেছে চালু করার কাজ — যন্ত্র চালু করা, চিপের ট্রে জাগিয়ে তোলা, ছোট ছোট মেশিন-লার্নিং পরীক্ষা।

তারপর একদিন গ্রাউন্ড স্টেশনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পৃথিবী থেকে একটা নির্দেশ পাঠানো হলো: মহাকাশে থাকা নিয়ে একটা হাইকু লেখো। স্যাটেলাইটের ভেতরে থাকা জেমা ৪ মডেল উত্তর লিখল। নরওয়ের সভালবার্ডের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় সেই উত্তর নেমে এলো পৃথিবীতে। গুগল একে বলেছে তাদের “হ্যালো ওয়ার্ল্ড” মুহূর্ত — প্রোগ্রামারদের ভাষায়, কোনো নতুন যন্ত্র প্রথমবার ঠিকঠাক চলছে কি না, তার সবচেয়ে ছোট প্রমাণ।

এরপর তারা মহাকাশ-থিমের লিমেরিক আর যন্ত্রের অবস্থা জানানোর মতো নির্দেশও পরীক্ষা করেছে। কিন্তু হাইকুটাই থেকে গেল। কারণ হাইকু বেছে নেওয়াটা কাকতালীয় নয়। একটা যন্ত্রকে যখন প্রথমবার কথা বলতে দেওয়া হয়, তখন তাকে বড় কোনো হিসাব করতে বলা হয় না। তাকে বলা হয়, তুমি কোথায় আছো, সেটা বলো।

কেন মহাকাশ

প্রশ্নটা স্বাভাবিক — ডেটা সেন্টার তো মাটিতেই বানানো যায়, মহাকাশে তোলার দরকার কী? গুগলের যুক্তিটা বিদ্যুৎ নিয়ে। এআই যত বড় হচ্ছে, তার খিদেও তত বাড়ছে। ডেটা সেন্টার বানাতে জমি লাগে, বিদ্যুৎ লাগে, গ্রিডের অনুমতি লাগে। কোথাও কোথাও সেই গ্রিডই এখন চাপে আছে।

মহাকাশে সূর্যের আলো প্রায় কখনো ফুরায় না। সঠিক কক্ষপথে — ভোর-সন্ধ্যার সূর্য-সমকালীন কক্ষপথে — একটা স্যাটেলাইট প্রায় সারাক্ষণ আলোয় থাকতে পারে। গুগলের হিসাব, সেই কক্ষপথে একটা সৌর প্যানেল মাটির তুলনায় পাঁচ থেকে আট গুণ বেশি বিদ্যুৎ দিতে পারে। তাই তাদের স্বপ্নটা এমন: সূর্যের আলোয় চলা, লেজার-সংযুক্ত স্যাটেলাইটের ঝাঁক, যারা একসঙ্গে একটা ডেটা সেন্টারের মতো কাজ করবে।

এই স্বপ্নের একটা নকশাও তারা প্রকাশ করেছে — ৮১টি স্যাটেলাইটের একটা উদাহরণ, যারা এক কিলোমিটারের মধ্যে কাছাকাছি উড়বে আর লেজারে কথা বলবে। কাগজে-কলমে শুনতে দারুণ লাগে। কিন্তু কাগজ আর কক্ষপথের মধ্যে অনেকটা দূরত্ব আছে, আর গুগল নিজেও সেটা লুকায় না। এই প্রকল্পকে তারা “মুনশট” বলে — মানে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, আজকের কোনো পণ্য নয়।

সেই দূরত্বটা বোঝার জন্য পরীক্ষামূলক স্যাটেলাইটের আকারটা জানা দরকার। খবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতে চারটি টিপিইউ আছে, কিন্তু একসঙ্গে একটাই চলে, প্রায় বিশ মিনিটের মতো করে। বিদ্যুৎ উৎপাদনও প্রায় এক কিলোওয়াটের কাছাকাছি — একটা বড় বাড়ির চাহিদার চেয়ে কিছু বেশি। অর্থাৎ এটা এখনো কোনো ডেটা সেন্টার নয়। এটা একটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার যন্ত্র: মহাকাশের তাপ আর বিকিরণে এই চিপগুলো টিকে থাকে কি না।

সেই প্রশ্নের একটা অংশের উত্তর অবশ্য মাটিতেই পাওয়া গেছে। গুগল জানিয়েছে, তাদের ট্রিলিয়াম টিপিইউকে প্রোটন-রশ্মির সামনে রেখে পরীক্ষা করা হয়েছে, আর পাঁচ বছরের মিশনের সমান বিকিরণেও সেটা স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়নি। কিন্তু মাটির ল্যাব আর কক্ষপথ এক নয়। মহাকাশে তাপ ছড়ানোর জন্য বাতাস নেই, ঠান্ডা করার উপায়ও আলাদা। তাই পরের পরীক্ষাগুলো হবে তাপ-চাপ আর বিকিরণের মধ্যেই চিপ কেমন চলে, সেটা দেখা।

যা এখনো প্রমাণ হয়নি

এখানেই খবরটাকে ঠান্ডা মাথায় পড়া দরকার। হাইকু আসা মানেই মহাকাশের ডেটা সেন্টার চালু হয়ে যাওয়া নয়। গুগলের পরের ধাপ ২০২৭ সালে — দুটি স্যাটেলাইট একসঙ্গে উড়িয়ে তাদের মধ্যে লেজার-সংযোগ পরীক্ষা করা। তারপরও বাকি থাকবে অনেক কিছু: স্যাটেলাইট থেকে পৃথিবীতে বিপুল ডেটা নামানো, মহাকাশে যন্ত্র নষ্ট হলে মেরামতের উপায়, আর সবচেয়ে বড় কথা, খরচ।

গুগলের নিজের হিসাবেই, উৎক্ষেপণের খরচ প্রতি কিলোগ্রামে প্রায় ২০০ ডলারে না নামলে মহাকাশের কম্পিউটিং মাটির বিদ্যুৎ-খরচের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না। সেটা ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝির আগের কথা নয়, তাও যদি উৎক্ষেপণের দাম সত্যিই সেভাবে কমে। অর্থাৎ এই হাইকু কোনো সমাপ্তি নয়, একটা দীর্ঘ পরীক্ষার প্রথম লাইন।

আর এই খবর এমন এক সপ্তাহে এসেছে, যখন এআই-এর খরচ নিয়েই বাজারে সবচেয়ে বেশি কথা হচ্ছে। ২ নভেম্বর মার্ভেল ঘোষণা দিয়েছে লুমেন্টামকে প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে কেনার — আলো দিয়ে ডেটা পাঠানোর প্রযুক্তির জন্য। একই সময়ে অ্যানথ্রপিকের ফাইলিংয়ে উঠে এসেছে বিপুল কম্পিউটিং-প্রতিশ্রুতির অঙ্ক। দুটো খবরই একই কথা বলছে, ভিন্ন ভাষায়: এআই চালাতে এখন শুধু ভালো মডেল যথেষ্ট নয়, বিদ্যুৎ, তার আর আলোর হিসাবটাও মেলাতে হবে।

সানক্যাচারের হাইকু সেই হিসাবেরই একটা কাব্যিক দিক। মাটিতে আমরা যখন কোনো চ্যাটবটকে প্রশ্ন করি, তখন তার পেছনে কোথাও একটা ভবন গরম হচ্ছে, ফ্যান ঘুরছে, বিদ্যুৎ পুড়ছে। মহাকাশের এই পরীক্ষা জিজ্ঞেস করছে, সেই ভবনটাকে যদি আকাশে তুলে সূর্যের আলোয় চালানো যায়, তাহলে কী হয়। উত্তরটা এখনো জানা নেই। জানা শুধু এইটুকু — একটা চিপ মহাকাশে উঠেছে, চালু হয়েছে, আর ফিরে এসে তিন লাইনে বলেছে, নিচে পৃথিবীটা নীল দেখাচ্ছে।

আমি খবরটা পড়ে ফোনটা নামিয়ে জানালার দিকে তাকিয়েছিলাম। বাইরে তখন ঢাকার রাতের আলো, আর তার ওপরে আকাশ। কোথাও ওপরে, একটা ছোট যন্ত্র সূর্যের আলো গায়ে মেখে ঘুরছে, আর তার ভেতরে একটা মডেল অপেক্ষা করছে পরের নির্দেশের। হয়তো পরের নির্দেশটা আর কবিতা হবে না — হবে তাপমাত্রার রিপোর্ট, বিকিরণের হিসাব। কিন্তু প্রথম কথাটা কবিতাই ছিল। এটা মনে রাখার মতো।

শেয়ার করুন:ftinX