ভেজার অন্য ধরন

বৃষ্টি প্রথমে কাচে এসে লাগে। শব্দটা খুব ছোট। টোকা দেওয়ার মতোও নয়, আবার ফোঁটা পড়ার শব্দের চেয়ে একটু বেশি কিছু। আমি তাকিয়ে থাকি। ফোঁটাটা থামে, কাঁপে, তারপর নিজের ওজনেই গড়িয়ে নেমে যায়, পেছনে ফেলে যায় একটা সরু, আঁকাবাঁকা দাগ।
একটা ফোঁটা একা নামে না বেশিক্ষণ। পাশেরটার গায়ে গিয়ে লাগে, দুটো মিলে একটু বড় হয়, আর তখন নামার গতিটাও বদলে যায়। মাঝপথে আবার থেমে থাকে কিছুক্ষণ — যেন নিচে যাওয়ার তাড়া তার নেই। আমারও তাড়া নেই আজ। চেয়ারটা জানালার কাছেই টেনে বসে আছি অনেকক্ষণ।
কাচের ওপারে শহরটা আবছা। রিকশার হুডের ওপর বৃষ্টি পড়ছে, হলুদ আলো ভিজে রাস্তায় লম্বা হয়ে ছড়িয়ে আছে। মানুষগুলোকে চেনা যায় না, শুধু তাদের ছুটে যাওয়াটা বোঝা যায়। কেউ ছাতা উল্টে যাওয়ার ভয়ে দুই হাতে আঁকড়ে ধরেছে, কেউ দোকানের শেডের নিচে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে হিসাব করছে — এখন বেরোবে, নাকি আরও অপেক্ষা করবে।
ঘরের ভেতরটা চুপ।
এই চুপটা ফাঁকা নয়। এর ভেতর ঘড়ির কাঁটার শব্দ আছে, মাঝে মাঝে ফ্রিজের গুনগুন আছে, টেবিলে রাখা কাপের চা ঠান্ডা হতে হতে একটা হালকা গন্ধ ছেড়ে যাচ্ছে। বাইরে এত শব্দ, অথচ কাচের এই একটা পর্দা সবটাকে দূরের করে দিয়েছে। মনে হয় শব্দগুলো আসছে অন্য কোনো বিকেল থেকে, অন্য কোনো রাস্তা থেকে।
জানালার এক পাশে হালকা ফাঁক আছে, সেখান দিয়ে ভেজা মাটির গন্ধ ঢোকে মাঝে মাঝে। গন্ধটা এলেই ঘরটা আর ঠিক ঘর থাকে না, মনে হয় বারান্দায় বসে আছি। পর্দাটা সামান্য নড়ে। নড়াটা বাতাসের জন্য, তবু তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হতে থাকে, পর্দাটাও যেন বৃষ্টির দিকে একটু ঝুঁকে আছে।
ছোটবেলায় কাচ ঘোলা হয়ে গেলে আমি আঙুল দিয়ে তাতে লিখতাম। নিজের নাম। উল্টো দিক থেকে পড়া যেত না, তবু লিখতাম। মা ডাক দিলে হাতের তালু দিয়ে মুছে দিতাম তাড়াতাড়ি — লেখাটা মুছত, কিন্তু আঙুলের দাগগুলো থেকে যেত কাচে, পরের বার ঘোলা হলেই আবার ফুটে উঠত। এখন মনে হয়, ওই দাগগুলো মোছার ছিল না। ওগুলো ছিল, তাই বারবার ফিরে আসত।
বৃষ্টি বাড়লে কাচে আর কিছু দেখা যায় না। ধারাগুলো একটার পর একটা নামতে থাকে, ওপারের গাছটা শুধু একটা সবুজ ঝাপসা হয়ে থাকে।
কিন্তু আমি সরে যাই না।
একটা সময় ছিল, বৃষ্টি এলেই বাইরে বেরিয়ে পড়তাম। ভেজার জন্য আলাদা করে কোনো কারণ লাগত না। স্কুল থেকে ফেরার পথে বৃষ্টি নামলে ব্যাগটা বুকের কাছে চেপে ধরে দৌড় দিতাম, পায়ের কাছে ছিটকে উঠত কাদাজল, বাড়ি ফিরে বকা খেতাম, আবার পরের দিন একই কাজ। ভেজা জুতোর ভেতরে পা রাখার সেই ঠান্ডা টেরটা এখনো মাঝে মাঝে পায়ে এসে লাগে, বিশেষ করে এমন বৃষ্টির বিকেলে, জানালার পাশে চুপ করে বসে থাকলে। এখন বৃষ্টি এলে জানালা পর্যন্তই যাওয়া হয়। দরজা পর্যন্ত নয়। কেন যেন মনে হয়, জানালার এপারে বসে থাকাটাই এখন ভেজার অন্য একটা ধরন — গা ভেজে না, তবু কোথাও একটা ভিজে ওঠে।
মাঠের দিকের জানালাটায় বৃষ্টি অন্যরকম। ওদিকে শহর নেই, একটা খালি জায়গা আছে, তার ওপাশে কয়েকটা গাছ। বৃষ্টির দিনে মাঠটা ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে ওঠে, মাঝখানের জমে থাকা পানিতে ফোঁটাগুলো পড়ে আর গোল গোল ঢেউ ছড়িয়ে মিলিয়ে যায়। একটা ঢেউ আরেকটাকে ছোঁয়ার আগেই শেষ। দেখতে দেখতে সময়ের হিসাব থাকে না। হয়তো এজন্যই বৃষ্টির দিনে ঘড়ি দেখতে ইচ্ছা করে না।
ওই মাঠের ধারে একটা কাক ভিজছে তারের ওপর বসে। উড়ে যাওয়ার কোনো তাড়া দেখি না তার মধ্যে। মাঝে মাঝে গা ঝাড়া দেয়, ফোঁটাগুলো ছিটকে পড়ে, আবার চুপ করে বসে থাকে। বৃষ্টির মধ্যে এই চুপ করে বসে থাকাটা তার কাছেও হয়তো নতুন কিছু নয়।


