বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫৬:৩১ পূর্বাহ্ণ
আমার সাথে যুক্ত থাকুনXin

পাশে থেকেও দূরে

সেদিন রাতে আমরা সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছিলাম। ভাতের হাঁড়ি থেকে তখনো ধোঁয়া উঠছিল। টেবিলের মাঝখানে রাখা ছিল ডালের বাটি। জানালা গলে রাস্তার হলদে আলো এসে পড়ছিল ঘরের এক কোণে। মা পাশের বাসার খালার কথা বলছিলেন। কয়েক দিন আগে হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন। এখন নাকি লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারেন না। কথাগুলো বলতে বলতে মা একবার আমার দিকে তাকালেন, একবার অন্যদের দিকে। হয়তো আশা করেছিলেন, কেউ কিছু জানতে চাইবে।

কিন্তু কেউ কিছু বলল না।

অথচ ঘরে শব্দের অভাব ছিল না। কারও ফোনে ভিডিও চলছিল, কেউ মেসেজ লিখছিল, কেউ আবার খেতে খেতে খবর পড়ছিল। আমরা সবাই নিজের মতো ব্যস্ত ছিলাম। শুধু মায়ের কথাগুলো শোনার মতো সময় যেন কারও ছিল না।
মা একসময় কথা থামিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। তারপর ডালের বাটিটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ডালটা আরেকটু নাও।’ সেই বাক্যটা কেন যেন আমার কানে অনেকক্ষণ আটকে রইল। মানুষ যখন বোঝে তার কথা কারও কাছে পৌঁছাচ্ছে না, তখন সে কথা বদলে ফেলে — যত্নের ভাষা বেছে নেয়, যেটা শুনতে কারও মনোযোগ লাগে না।

আমি যে খুব মন দিয়ে শুনছিলাম, তা-ও না। আমার ফোনটা টেবিলের পাশেই উল্টো করে রাখা ছিল, তবু মাঝে মাঝে আলো জ্বলে উঠছিল। প্রতিবারই মনে হচ্ছিল, একবার দেখে নিই — কে জানে জরুরি কিছু কিনা। একবার তাড়াতাড়ি দেখতে গিয়ে মায়ের কথার মাঝের অংশটাই হারিয়ে ফেললাম। শেষটা শুনলাম, শুরুটা শুনেছিলাম, কিন্তু মাঝখানে যে জায়গাটায় তাঁর গলা একটু নরম হয়ে এসেছিল, সেটা আর ফেরত পাওয়া গেল না। পরে জিজ্ঞেস করতেও কেমন লজ্জা লাগল।

এই দৃশ্যটা আমাদের বাসার একার না, মনে হয়। চায়ের দোকানে গেলে প্রায়ই দেখি, এক টেবিলে চারজন মানুষ বসে আছে। অথচ কারও সঙ্গে কারও তেমন কথা হচ্ছে না। চারজনের হাতেই চারটা ফোন। মাঝে মাঝে কেউ একজন নিজের ফোনের দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে। বাকিরা তখন কৌতূহল নিয়ে তার দিকে তাকায়। কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করে, ‘কী হয়েছে?’ কিন্তু উত্তর শোনার আগেই আবার যে যার ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
বাসে জানালার পাশে বসা ছেলেটাকে দেখি, পুরোটা পথ ফোনের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দেয়। বাইরে কত মানুষ, কত দোকানপাট, কত পরিচিত-অপরিচিত দৃশ্য পেছনে পড়ে যাচ্ছে, সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। বন্ধুদের আড্ডাতেও এখন প্রায় একই দৃশ্য। একজন হয়তো খুব আগ্রহ নিয়ে কোনো গল্প বলছে। দুজন মন দিয়ে শুনছে, আর তৃতীয়জন নিজের ফোনে পুরোনো ছবি খুঁজছে। গল্পের সঙ্গে সেই ছবির কোনো সম্পর্ক নেই। তবু সে খুঁজেই যাচ্ছে।

আমরা প্রায়ই বলি, ‘সময় পাই না।’ কথাটা যে একেবারে মিথ্যে, তা-ও নয়। কাজের চাপ আছে, পড়াশোনা আছে, সংসারের নানা হিসাব আছে। দিন শেষে শরীর সত্যিই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু খাবার টেবিলে যে আধঘণ্টা আমরা একসঙ্গে বসেছিলাম, সেই সময়টুকুতে তো কেউ কোথাও ছুটছিলাম না। তবু কেন যেন আমরা সেখানে থেকেও পুরোপুরি সেখানে ছিলাম না।
শরীরটা চেয়ারে বসে ছিল ঠিকই, কিন্তু মন পড়ে ছিল অন্য কোথাও। কারও অফিসের মেইলে, কারও ফেসবুক পোস্টে, আবার কারও মনোযোগ আটকে ছিল অচেনা কোনো মানুষের ভিডিওতে। এভাবেই আমাদের মনটা যেন কত জায়গায় ভাগ হয়ে যাচ্ছিল। শুধু পাশে বসে থাকা মানুষটার জন্যই খুব সামান্য মনোযোগ অবশিষ্ট থাকছিল।

আগে কোথাও অপেক্ষা করার সময়টুকুও অন্যরকম ছিল। ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে বসে মানুষ পাশের অপরিচিত লোকটার সঙ্গেও দু-চারটা কথা বলত। লঞ্চঘাটে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকত, আশপাশের মানুষের সঙ্গে গল্প করত। কারও বাসায় বেড়াতে গেলে চা আসার আগের সময়টুকুতে কত খোঁজখবর নেওয়া হতো! কার মেয়ের পরীক্ষা কেমন হলো, কার বাবা অসুস্থ, কে কেমন আছে—এসব নিয়েই কথা চলত।

এখন সেই দৃশ্যগুলো খুব একটা চোখে পড়ে না। কোথাও একটু অপেক্ষা করতে হলেই আমরা ফোন বের করি। ডাক্তারের চেম্বার হোক কিংবা লঞ্চঘাট, সময় কাটানোর জন্য হাতের কাছে একটা ফোন থাকলেই যেন চলে। পাশে কে বসে আছে, কী করছে, সেদিকে তাকানোরও প্রয়োজন পড়ে না। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা এখন আর চুপচাপ বসে থাকতেও পারি না। হাতে কোনো কাজ না থাকলেই অস্বস্তি লাগে। মনে হয়, কিছু না করে বসে থেকে অযথা সময় নষ্ট করছি। অথচ একসময় এই অবসরটুকুই মানুষকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসত। অল্প কিছু কথায় পরিচয় হতো, খোঁজখবর নিতে নিতে সম্পর্ক গড়ে উঠত। তার জন্য আলাদা কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হতো না।

ছোটবেলায় সন্ধ্যা নামলেই আমাদের বাসায় কেউ না কেউ বেড়াতে আসত। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনলেই মা চায়ের পানি বসাতেন। সঙ্গে একটা বাটিতে মুড়ি কিংবা ঘরে যা থাকত, তা-ই এনে দেওয়া হতো। তারপর শুরু হতো গল্প। বড়রা বসে কত কথা বলতেন! কার সংসারে কী হচ্ছে, কে কেমন আছে, পুরোনো দিনের কত স্মৃতি—কথার যেন শেষ ছিল না। কেউ ঘড়ির দিকে তাকাতেন না, বাড়ি ফেরারও তেমন তাড়া ছিল না।

আমি তখন ছোট। বড়দের পাশে বসে চুপচাপ সেসব গল্প শুনতাম। এত বছর পর কথাগুলোর বেশির ভাগই আর মনে নেই। কিন্তু সেই সন্ধ্যাগুলোর কথা মনে আছে। সবাই মিলে বসে থাকা, হাসাহাসি করা, একটার পর একটা গল্প চলতে থাকা—সবকিছুর মধ্যে কেমন একটা আপন অনুভূতি ছিল।

এখন আর তেমনটা হয় না। কারও সঙ্গে দেখা করতে হলেও আগে থেকে দিন ঠিক করতে হয়, সময় মিলিয়ে নিতে হয়। তারপর দেখা হলেও কত ব্যস্ততা! কেউ বারবার ঘড়ি দেখে, কেউ ফোনে মেসেজের উত্তর দেয়, কারও আবার তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।

একসময় কারও খোঁজখবর নিতে হলে তার বাড়িতে যেতে হতো। দূরে থাকলে চিঠি লিখতে হতো, কিংবা কারও মাধ্যমে খবর পাঠাতে হতো। এখন আর সেসবের প্রয়োজন হয় না। ঘরে বসেই আমরা জানতে পারি, কে কোথায় যাচ্ছে, কী খাচ্ছে, কার মন ভালো, কার মন খারাপ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে পরিচিত মানুষগুলোর জীবনের কত খবরই না আমাদের জানা থাকে!

অথচ এত কিছু জানার পরও সামনাসামনি দেখা হলে অনেক সময় কথা খুঁজে পাই না। দু-চারটা সাধারণ খোঁজখবর নেওয়ার পরই যেন কথা ফুরিয়ে আসে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা এখন মানুষটার চেয়ে তার প্রতিদিনের খবরগুলোর সঙ্গেই বেশি পরিচিত হয়ে উঠেছি। সে কোথায় ঘুরতে গেল, কী ছবি দিল, কী লিখল—এসব জানি। কিন্তু মানুষটা আসলে কেমন আছে, তার দিনগুলো কীভাবে কাটছে, সে কথা আর জানতে চাওয়া হয় না।

তবে এসব ভাবতে গিয়ে নিজের কথাও মনে পড়ে। অন্য কাউকে ফোনে ব্যস্ত থাকতে দেখে বিরক্ত হওয়া যতটা সহজ, নিজের ভুলগুলো স্বীকার করা ততটা সহজ নয়। আমিও তো কতবার এমন করেছি! কেউ হয়তো আমার সঙ্গে কথা বলছে, আমি তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ছি। অথচ মনে মনে ভাবছি, ফোনে আসা মেসেজটার কী উত্তর দেব। কখনো আবার কথা শুনতে শুনতেই ফোনটা হাতে তুলে নিয়েছি।

আমরা হয়তো ভাবি, সামনের মানুষটা এসব বুঝতে পারছে না। কিন্তু মানুষ অনেক কিছুই বুঝতে পারে। বিশেষ করে যখন তার কথা কেউ মন দিয়ে শুনছে না। চোখের দিকে তাকালেই অনেক সময় বোঝা যায়, মানুষটা সামনে বসে থাকলেও তার মন অন্য কোথাও পড়ে আছে।

ছোট বাচ্চারা বোধহয় এসব আরও সহজে বুঝতে পারে। ওরা যখন খুব আগ্রহ নিয়ে কিছু বলতে আসে, আর আমরা ফোনের দিকে তাকিয়ে শুধু ‘হুম’, ‘আচ্ছা’ বলে যাই, তখন একসময় ওরা চুপ করে যায়। কখনো আবার বারবার ডাকে, হাত ধরে টানে, নিজের দিকে তাকাতে বলে।

হয়তো ওদের তখন খুব জরুরি কিছু বলার থাকে না। শুধু চায়, আমরা একটু ফোনটা নামিয়ে ওদের দিকে তাকাই। ওদের ছোট্ট কথাগুলো একটু মন দিয়ে শুনি।

কিছুদিন আগে অনেক দিন পর এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ঠিক করেছিলাম, সন্ধ্যায় কোথাও বসে চা খাব, অনেক গল্প করব। গল্প হচ্ছিলও। সে তার নতুন চাকরির কথা বলছিল। বলছিল, আজকাল নাকি রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না। কথাগুলো বলতে বলতেই একসময় সে থেমে গেল। আমি তখন ফোনে আসা একটা নোটিফিকেশন দেখছিলাম। কীসের নোটিফিকেশন ছিল, এখন আর মনেও নেই।

বন্ধু কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে চায়ের কাপটা নাড়াচাড়া করল। তারপর অন্য প্রসঙ্গে কথা শুরু হলো। সাধারণ কিছু কথাবার্তা, হাসিঠাট্টা। কিন্তু সে যে কথাটা বলতে গিয়ে থেমে গিয়েছিল, সেটায় আর ফিরে গেল না।

বাসায় ফেরার পথে ঘটনাটা বারবার মনে পড়ছিল। হয়তো সেদিন সে আমাকে কোনো সমস্যার কথা বলতে চেয়েছিল। হয়তো নতুন চাকরিতে মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল, কিংবা অন্য কোনো দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারছিল না। আবার এমনও হতে পারে, তেমন কিছুই নয়। শুধু নিজের ক্লান্তির কথাটুকু কাউকে বলতে চেয়েছিল।

কিন্তু আমি আর জানতে পারিনি।

পরে ভেবে দেখেছি, আমাদের অনেক সম্পর্কই বোধহয় এভাবে ধীরে ধীরে বদলে যায়। সব সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার পেছনে বড় কোনো ঝগড়া কিংবা ভুল বোঝাবুঝি থাকে না। কখনো কখনো কারও কথা মন দিয়ে না শোনা, গল্পের মাঝখানে ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়া, কিংবা কেউ কিছু বলতে চাইলে গুরুত্ব না দেওয়ার মধ্য দিয়েও দূরত্ব তৈরি হয়।

সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হলো, এই দূরত্ব তৈরি হওয়ার সময় আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না।

সেদিন খাবার টেবিলে মায়ের কথাগুলো থেমে যাওয়ার ঘটনাটাও অনেকটা এমনই ছিল। মা কারও কাছে কোনো অভিযোগ করেননি। কেউ তাঁর কথা শুনছে না বলে রাগও করেননি। শুধু কথা বলা বন্ধ করে ডালের বাটিটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়েছিলেন।

অথচ মা তো চাইলে বলতে পারতেন, ‘কী ব্যাপার, আমার কথা কেউ শুনছ না কেন?’

কিন্তু তিনি তা বলেননি।

মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোই বোধহয় নিজেদের কষ্টের কথা সবচেয়ে কম বলে। আমরা তাদের কথা মন দিয়ে না শুনলেও তারা কিছু বলে না। আগের মতোই খোঁজখবর নেয়, খেতে ডাকে, যত্ন করে। শুধু নিজেদের কথাগুলো বলা একটু একটু করে কমিয়ে দেয়।

আর আমরা ভাবি, সবকিছু আগের মতোই আছে। কেউ তো রাগ করছে না, কোনো ঝগড়াও হচ্ছে না। অথচ কখন যে একসঙ্গে বসেও আমাদের মধ্যে কথা কমে আসতে শুরু করে, সেটা আমরা টেরই পাই না।

সেদিন রাতে খাওয়াদাওয়া শেষে সবাই যার যার মতো উঠে গেল। টেবিলে এঁটো প্লেটগুলো পড়ে রইল। মা রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের পানি বসালেন। আমি তখনো টেবিলে বসে ছিলাম। অভ্যাসবশত ফোনটা হাতে নিয়েছিলাম। কী মনে করে আবার রেখে দিলাম, স্ক্রিনটা নিচের দিকে করে।

কিছুক্ষণ পর মা চা নিয়ে ফিরে এলেন। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা মা, পাশের বাসার খালা এখন কি একা একা হাঁটতে পারেন?’

মা একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। তারপর চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে মা আবার শুরু থেকে বলতে শুরু করলেন, ‘না রে, এখনো পারেন না। সেদিন তো…’

শেয়ার করুন:ftinX