বৃষ্টিভেজা এক নিস্তব্ধ বিকেল। জানালার কাঁচ বেয়ে জলের ধারা নামছে, আর আমার কোলে উপুড় হয়ে আছে মুরাদ কিবরিয়ার প্রথম উপন্যাস ‘নিনাদ’। বইটার শুরু থেকেই অদ্ভুত এক টানটান উত্তেজনা, পলক ফেলার সুযোগ নেই। কিন্তু কয়েক পৃষ্ঠা উল্টাতেই হঠাৎ একটা জায়গায় এসে আমার চোখ আটকে গেল। উপন্যাসের নায়ক রশিদ—যাকে সবাই ‘কুফা রশিদ’ বলে ডাকে। বয়স তখন মাএ মোটে এগারো। অথচ এই ছোট্ট বয়সেই সে একটা ভয়ংকর সত্যি জেনে গেছে। আর তা হল—‘মানুষ আসলে মাদারচোদ।’
বাক্যটা পড়ে আমি কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইলাম। সাহিত্যে গালাগালি থাকাটা নতুন কিছু নয়, কিন্তু এত নিখুঁত, এত মোক্ষম জায়গায় একটা গালির এমন শৈল্পিক ব্যবহার আমি আগে কখনো দেখিনি। বাক্যটা যেন আমার চিন্তার জানালায় সজোরে ধাক্কা দিল।
পরপর দুই দিন বাক্যটা আমার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেল। তারপর হঠাৎ একদিন মনে হলো, কথাটার ভেতর তো কোনো খাদ নেই! রূঢ় হলেও এটাই চরম বাস্তব। তবে হ্যাঁ, সবাইকে এক পাল্লায় মাপাটা অবিচার। বাক্যটা একটু সংস্কার করে যদি বলা হয়, ‘কিছু মানুষ আসলে মাদারচোদ,’ তাহলে বোধহয় সেটাই নিখুঁত হবে।
মজার ব্যাপার হলো, উপন্যাসের নায়ক রশিদ এই কঠিন, অকাট্য সত্যটা বুঝে ফেলেছিল মাত্র এগারো বছর বয়সেই। আর আমি? জীবনের এক-চতুর্থাংশ পার হয়ে তবেই এসে ঠেকেছি সেই একই উপলব্ধির সামনে।
তবে এই উপলব্ধিটা হঠাৎ করে আসেনি। বরং ধীরে ধীরে, ছোট ছোট কিছু ঘটনার ভেতর দিয়ে এটা আমার ভেতরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
একদিন বিকেলে দোকানে বসে আছি। এমন সময় এক ভিক্ষুক এসে দাঁড়ালো। তার হাঁটাচলা, শরীরের গড়ন আর চেহারার জৌলুস দেখে যে কেউ বাজি ধরে বলতে পারবে, লোকটা সম্পূর্ণ সুস্থ এবং কর্মক্ষম। এমন মানুষদের আমি সাধারণত এড়িয়ে চলি। কারণ ভিক্ষাবৃত্তি এখন আর কোনো নিরুপায় মানুষের শেষ আশ্রয় নেই, এটা রীতিমতো একটা ‘জিরো ইনভেস্টমেন্ট’ কর্পোরেট ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
একটু হিসাব করলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়। আমাদের এই মার্কেটটা আট তলার। আন্ডারগ্রাউন্ড সহ ছয়টি ফ্লোরে রমরমা ব্যবসা চলে! প্রতি ফ্লোরে চারশ’ দোকান। ছয় ফ্লোরে চব্বিশ শ’। সবাই হয়তো টাকা দেয় না, কিন্তু গড়ে প্রতি ফ্লোর থেকে একশ’ দোকানদার তো দেয়ই! ছয়শ’ দোকান থেকে যদি সে দুই টাকা করেও পায়, দিনে বারোশ’ টাকা আয়। আশ-পাশে এমন আরও আট-দশটা বহুতল কমপ্লেক্স আছে। কোনো মূলধন নেই, মাথার ঘাম পায়ে ফেলার ক্লান্তি নেই, বসের ঝাড়ি নেই—প্রতিদিন অনায়াসে দুই-তিন হাজার টাকা ইনকাম। তাহলে সে কেন রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে গাধার খাটুনি খাটতে যাবে?
আমি লোকটার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললাম, ‘সামনে দেখেন ভাই, আপনাকে দিতে পারবো না।’
সাধারণত ‘সামনে দেখেন’ এটুকু বললে ভিক্ষুকরা চলে যায়। কিন্তু সে? এমনভাবে আমার দিকে তাকালো, যেন সে তার পৈতৃক সম্পত্তি আমার কাছে গচ্ছিত রেখেছিল, আর আমি এখন সেটা আত্মসাৎ করার পাঁয়তারা করছি। তাই উল্টো জেরা করে বসলো, ‘কেন দিবি না? দিলে সমস্যা কী?’
ভদ্রতা ভুলে সে সোজা ‘তুই-তোকারি’তে নেমে এসেছে। তার এমন অধিকারবোধ দেখে আমার মেজাজটা একটু চড়লেও সামলে নিয়ে বললাম, ‘আপনাকে তো সম্পূর্ণ সুস্থ মনে হচ্ছে। কাজ করে তো খেতে পারেন। তা না করে ভিক্ষা করছেন কেন?’
সে যেন এই প্রশ্নের জন্যই তৈরি ছিল। সাথে সাথে চোখ রাঙিয়ে সে বলল, ‘আমি কেন ভিক্ষা করি, সেটা কি তোর কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে?’ বুঝলাম, এর সাথে কথা বাড়ানো মানে নিজের সম্মান এবং সময় দু’টোই নষ্ট। আমি চুপ করে গেলাম।
আমাদের তর্কাতর্কি আর তার উদ্ধত আচরণ আশেপাশের দোকানদাররাও লক্ষ্য করছিল। ফলে ওই ভিক্ষুক যখন তাদের কাছে গেল, তারাও তাকে ফিরিয়ে দিল। মুহূর্তেই সে বুঝতে পারল, আমার সাথে এই তর্কের কারণে তার ব্যবসায় লালবাতি জ্বলতে শুরু করেছে। এবার সে ক্ষিপ্ত হয়ে আমার দিকে ধেয়ে এলো। যেন কাঁচাই চিবিয়ে খাবে আমাকে। কাউন্টারের একদম কাছে এসে দাঁত কটমট করে বলল, ‘তুই আমার হক নষ্ট করছিস! তুই ধ্বংস হয়ে যাবি!’
আমি কৌতূহল আটকে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তা কবে হবো?’ সে ফোঁস করে উঠে বললো, ‘খুব তাড়াতাড়ি।’
এরপর সে হনহন করে চলে গেল। এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ঘটনার পর থেকে ওই লোকটা আর কোনোদিন আমার দোকানের ত্রিসীমানায় আসেনি। আমি দোকানে থাকি বা না থাকি, সে এই দিকটা ফিরেও তাকায় না!
সেদিন জীবনে প্রথমবারের মতো আমিও এই কঠিন সত্য উপলব্ধি করলাম— ‘কিছু মানুষ আসলে মাদারচোদ।’ আর এসব মাদারচোদের কারণে সত্যিকার অর্থে যারা সাহায্য পাওয়ার অধিকার রাখে, তারা বঞ্চিত হয়। কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক সবসময় শক্তি সঞ্চয় করতে চায়। প্রতিটা মানুষকে আলাদা করে বিচার করা, কে আসল আর কে নকল তা বিশ্লেষণ করা—মস্তিষ্কের জন্য সময়সাপেক্ষ এবং খুব ক্লান্তিকর কাজ। তাই মস্তিষ্ক দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ‘শর্টকাট’ রাস্তা ব্যবহার করে। ‘‘একজন খারাপ = ওই দলের সবাই খারাপ’’, ‘‘একজন ভিক্ষুক ভণ্ড = রাস্তার সব ভিক্ষুকই ভণ্ড।’’ বিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলে ‘কগনিটিভ বায়াস’ (Cognitive Bias)।
দ্বিতীয়বারের মতো সেই একই উপলব্ধি করতে আমার খুব বেশি সময় লাগেনি।
সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা গোমড়ামুখো ছিল। বিকেলের দিকে চারপাশে এক ধরনের চাপা বিষণ্ণতা নেমে এলো। ঠিক তখনই হঠাৎ আমার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। কলার আইডিতে নামটা দেখে একটু অবাকই হলাম। আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টের একজন ‘সাহিত্যমনা’ তরুণী। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করে, টুকটাক লেখালেখি করে এবং এখান সেখান থেকে দেখি বেশ পুরস্কারও পায়। মাঝে মাঝে ইনবক্সে বই নিয়ে দু-এক কথার বাইরে তার সাথে আমার খুব একটা যোগাযোগ নেই।
ফোন রিসিভ করে হাই-হ্যালো আদান-প্রদানের পর, ওপাশ থেকে খুব করুণ একটা গলা ভেসে এল। ‘ভাইয়া, আমি আমার কিছু শখের, গিফট পাওয়া এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পুরস্কার পাওয়া অমূল্য বইয়ের কালেকশন বিক্রি করে দিতে চাচ্ছি। আপনি কি কিনবেন?’
আমি একটু থমকে গেলাম। গিফট পাওয়া, পুরস্কার পাওয়া অমূল্য কালেকশন ও শখের বই? জিজ্ঞেস করলাম, ‘হঠাৎ বই বিক্রি করবেন কেন? টাকার খুব দরকার?’
এরপর সে আমাকে এমন এক গল্প শোনাল, যা শুনে হাসব নাকি কাঁদব, বুঝতে পারলাম না। তার একটা বয়ফ্রেন্ড আছে। কিন্তু ছেলেটার গায়ের রঙ একটু চাপা, মানে কালো আরকি। আর এই আধুনিক, সাহিত্যমনা মেয়েটি তার কালো বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে লোকসমাজে ঘুরতে কিছুটা ‘লজ্জাবোধ’ করে! তাই সে একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে তার প্রেমিককে একটা বিদেশি দামি ‘কসকো’ সাবান কিনে দেবে। তার ধারণা, নিম পাতার সাথে এই সাবান মেখে সপ্তাহে সাত দিন গোসল করলে ছেলেটা ম্যাজিকের মতো ফর্সা হয়ে যাবে।
যেহেতু সাবানটা বিদেশি এবং বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন, তাই তার দামটাও বেশ চড়া। সুতরাং, মোটা অংকের টাকার প্রয়োজন। বন্ধু-বান্ধবীদের কাছে সে ধার চেয়ে পায়নি। আর বিষয়টা যেহেতু বয়ফ্রেন্ড নামক গোপন অধ্যায়ের সাথে জড়িত—সুতরাং এই কথা ফ্যামিলিকেও বলা যাবে না! তাই উপায়ান্তর না দেখে নিজের স্মৃতিমাখা বইগুলো সে বিক্রি করে দিতে চাইছে।
আমার জীবনে আমি কখনো পুরনো বই কিনিনি। কিন্তু মেয়েটার এই অদ্ভুত, হাস্যকর আর চরম বোকা বোকা প্রেমের গল্প শুনে আমি কেন যেন রাজি হয়ে গেলাম।
কিন্তু গল্পে টুইস্ট তখনো বাকি। রাজি হওয়ার পর সে আমাকে একটা শর্ত জুড়ে দিল, ‘ভাইয়া, এখন তো আমার খুব ঠেকা, তাই বইগুলো দিচ্ছি। কিন্তু আমার হাতে টাকা এলেই আমি আপনাকে টাকা ফেরত দেব, আর আপনি আমার বইগুলো আমাকে দিয়ে দেবেন। ঠিক আছে?’
আমার মেজাজটা এবার একটু চড়ল। বললাম, ‘দেখেন, আমি তো বন্ধক রাখার দোকান খুলিনি। বিক্রি করলে একেবারে করবেন। এই উদ্ভট শর্তে আমি বই কিনব না।’ মেয়েটা নাছোড়বান্দী। আমাকে কিনতেই হবে, আর শর্তটাও মানতে হবে। বেশ কিছুক্ষণ তর্কাতর্কির পর সে শেষমেশ হার মানল। শর্ত ছাড়াই বইগুলো বিক্রি করতে রাজি হলো। আমি সাথে সাথেই তাকে টাকা পাঠিয়ে দিলাম।
দিন কয়েক পর একটা এনার্জি বিস্কুটের কার্টনে বইগুলো আমার হাতে এসে পৌঁছাল। আমি সাধারণত নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নিতে পছন্দ করি, পুরনো বইয়ের এই ধুলোমাখা গন্ধটায় আমি অভ্যস্ত নই। তবে ভাবলাম, যেহেতু প্রথমবার পুরনো বই কিনলাম, একটা আনবক্সিং ভিডিও করে ফেসবুকে রিলস হিসেবে আপলোড করব।
ক্যামেরা অন করে কার্টন খুললাম। কিন্তু ভেতরে বই গুনতে গিয়ে দেখি একটা গণ্ডগোল। কথা ছিল বিশটা বইয়ের। কিন্তু কার্টনে বই আছে ঊনিশটা! মানে একটা বই মিসিং!
বিষয়টা জানিয়ে আমি তাকে মেসেজ দিলাম। কিন্তু সে তো আকাশ থেকে পড়ল। উল্টো আমাকেই চার্জ করে বসল! অকাট্য প্রমাণ হিসেবে আমি আনবক্সিংয়ের র (আনকাট) ফুটেজ তার কাছে পাঠালাম।
ভিডিও দেখে সে যে উত্তরটা দিল, তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। সে আমাকে জানাল, আমি নাকি খুব চালাক। ভিডিও করার আগেই নাকি আমি একটা বই সরিয়ে লুকিয়ে রেখেছি, তারপর আবার প্যাকিং করে এই আনবক্সিং নাটক সাজিয়েছি! শুধু তাই নয়, সে আরও শোনাল, ‘আমার বইগুলো একদম নতুনের মতো ছিল, আপনি আমাকে দাম অনেক কম দিয়েছেন। ঠকিয়েছেন আমাকে! আর আমিও ঠেকাই পড়ে বইগুলো আপনার কাছে বিক্রি করেছি—টাকার প্রয়োজন তাই।’
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। মানুষ অনায়াসে এত উদ্ভট কথা বলতে পারে? আমি আর কোনো তর্কে না গিয়ে বইয়ের মূল্য ক্যালকুলেশনের জন্য ল্যাপটপ খুলে বসলাম। রকমারি ডট কম—এ ঢুকে ওই ২০টা বইয়ের বর্তমান বাজারমূল্য হিসাব করলাম। ক্যালকুলেটরের স্কিনে যে সংখ্যাটা উঠল, সেটা দেখে আমার নিজেরই নিজের ওপর রাগ হলো। আমি তাকে যে টাকা দিয়েছি, তার সাথে মাত্র আড়াইশ টাকা যোগ করলে রকমারি থেকেই একদম ঝকঝকে নতুন বই কেনা যেত! আর ফেসবুকের বিভিন্ন ডিসকাউন্ট পেজ থেকে কিনলে, তাকে দেওয়া টাকার চেয়েও ৪০০-৫০০ টাকা কমে সব নতুন বই পেয়ে যেতাম। অথচ তার বিক্রিত বইগুলোর কয়েকটার অবস্থা এত করুণ যে, যায় যায় অবস্থা!
যাই হোক, আমি আর কথা বাড়ালাম না। বোকা বনেছি, সেটা মেনে নিয়ে বইগুলো আমার বুকশেলফে গুছিয়ে রাখলাম।
ঘটনার এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু না…..
বেশ কয়েক মাস পর। আমার শেলফে বইগুলো তখন দিব্যি নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। হঠাৎ একদিন সেই মেয়ের ফোন। ‘ভাইয়া, আমার বইগুলো আমি ফেরত নিতে চাই।’ আমি বেশ অবাক হয়ে বললাম, ‘আমাদের তো এমন কোনো কথা ছিল না। আপনি তো শর্ত তুলেই নিয়েছিলেন। আর এখন হঠাৎ ফেরত চাইছেন কেন?’
তখন মেয়েটা বেশ চড়া গলায় বলল, ‘আমার বই আমি ফেরত নেব, তাতে আপনার কী সমস্যা?’ আমি শান্ত গলায় তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, ‘দেখেন, আপনি বইগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন, আমি কিনে নিয়েছি। এগুলোর মালিক এখন আমি, আপনি নন।’
সে এবার নতুন চাল চালল। বলল, ‘ঠিক আছে, এখন তাহলে আমি এগুলো আপনার কাছ থেকে কিনে নেব।’ বললাম, ‘আপনি যে টাকা দিয়ে আমার কাছ থেকে কিনবেন, সেই টাকা দিয়ে বাজার থেকে নতুন বই কিনে নেন।’ কিন্তু তার একই জেদ। তার ওই বইগুলোই লাগবে। ওগুলোর সাথে নাকি তার আবেগ জড়িয়ে আছে।
আমার একটা অদ্ভুত বদভ্যাস আছে। আমার বুকশেলফে একবার যে বই জায়গা দখল করে, তাকে আমি আর কখনো চোখের আড়াল হতে দিই না। আমার শেলফের বইয়ের মূল্য আমার কাছে হীরার চেয়েও বেশি। এখান থেকে কেউ কোন বই পড়ার জন্য ধার চাইলেও, প্রয়োজনে আমি তাকে নতুন বই কিনে উপহার দেই, কিন্তু শেলফ খালি করি না।
আমি তাকে বললাম, ‘ঠিক আছে, কিনবেন যখন, তখন আমাকে ডাবল দাম দিতে হবে।’ ভেবেছিলাম ডাবল দাম শুনলে হয়তো সে আর এগোবে না। কিন্তু আমি ভুল ভেবেছিলাম। সে থামার পাত্রী নয়। সে আমাকে রীতিমতো হুমকি দেওয়া শুরু করল, ‘বইগুলো আমাকে ফেরত দিন, নইলে কিন্তু আমি অন্য কিছু করতে বাধ্য হবো।’
আমি মনে মনে হাসলাম। বুঝলাম, ‘এ কোনো সাধারণ মেয়ে নয় রে লায়লা, এ এক অদ্ভুত অ্যানিলিডা প্রাণী!’ আমি এরপর থেকে তার মেসেজ এবং কল ইগনোর করা শুরু করলাম।
দু’দিন পর আমার ইনবক্সে তার একটা লম্বা মেসেজ এল। ‘মানুষের উপকার করেন ভালো কথা, কিন্তু ক্ষতি কেন করেন? আপনি যদি বইগুলো ফেরত না দেন, তবে মনে রাখবেন, ওই বইগুলো আপনার জন্য অভিশাপ হয়ে যাবে!’ ইত্যাদি ইত্যাদি আরো অনেক কথা।
মেসেজটা পড়ে আমি কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম। আমার বুকশেলফে সাজানো ওই ঊনিশটা বইয়ের দিকে তাকালাম। আমি আসলে তার কী ক্ষতি করেছি? তার বইগুলো কিনে ক্ষতি করেছি? নাকি প্রতারণার শিকার হওয়ার পরও চুপ থেকে ক্ষতি করেছি? নাকি এখন আমার নিজের জিনিস বিক্রি করতে রাজি না হয়ে ক্ষতি করেছি?
সেদিন আমি আবার দ্বিতীয়বারের মতো উপলব্ধি করলাম— ‘কিছু মানুষ আসলে মাদারচোদ।’
আর মজার ব্যাপার হলো, এই মানুষগুলোকে সবচেয়ে বেশি খুঁজে পাওয়া যায় ভার্চুয়াল জগতে। যেখানে সম্পর্ক আছে, কিন্তু দায়বদ্ধতা নেই; পরিচয় আছে, কিন্তু সত্যতা নেই।
ঠিক এমনই এক অদ্ভুত পরিচয় হয়েছিল আমার—সোশ্যাল মিডিয়ায় এক গায়কের সাথে। পরিচয় বলতে ওই মাঝেমধ্যে ইনবক্সে ‘হাই-হ্যালো’ আর ছবিতে লাইক দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মানুষটাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না, কখনো সামনাসামনি দেখাও হয়নি।
ঈদের মাসখানেক আগের কথা। হঠাৎ একদিন গায়ক সাহেব আমাকে মেসেজ দিলেন। ‘ভাই, জীবনে কখনো ঢাকা শহর দেখিনি। এবার ঈদের পর ঢাকা আসব। কয়েকদিন ঘুরব আর আপনার বাসাতেই উঠব।’
বাঙালি হিসেবে আমাদের শিষ্টাচারের একটা ‘ডিফল্ট সেটিং’ আছে। কেউ অতিথি হয়ে আসতে চাইলে আমরা মুখের ওপর ‘না’ বলতে পারি না। আমিও ভদ্রতার খাতিরে বলে দিলাম, ‘ঠিক আছে, আসবেন।’
এরপর গায়ক সাহেবের আর কোনো খোঁজ নেই। ঈদের ব্যস্ততায় আমিও আর তার কথা মনে রাখিনি।
ঈদের চার দিন পর শহরের যান্ত্রিকতা থেকে একটু হাঁফ ছাড়তে আমি চলে গেলাম বান্দরবান। একেবারে গহিন পাহাড়ে, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্কের কোনো অস্তিত্ব নেই। টানা এক সপ্তাহ প্রকৃতির কাছাকাছি কাটিয়ে যখন আবার সভ্যতায় (নেটওয়ার্কের আওতায়) ফিরলাম, নেটওয়ার্ক অন হতেই দেখি মেসেজ আর মিসড কলের বন্যা। সবগুলো কল ওই গায়ক সাহেবের। আমি একটু অবাক হয়েই কলব্যাক করলাম।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কোন ভনিতা ছাড়া শুরু হলো কথার তুবড়ি। ‘ভাই, আপনি মানুষ নাকি অন্য কিছু? আমি ঢাকা আসব বলে বসে আছি, আর আপনি ফোন বন্ধ করে রেখেছেন? আমার ঈদের সব আনন্দ, সব প্ল্যান আপনি মাটি করে দিলেন!’
আমি স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম। আমাদের তো এমন কোনো ঘনিষ্ঠতা নেই যে সে আমার ওপর এতটা অধিকার খাটাবে! সে যদি আসতেই চাইত, তবে তো তার উচিত ছিল আগে থেকে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। অপরিচিত একজনের এমন অযৌক্তিক অধিকারবোধ আমাকে রীতিমতো অবাক করল।
আমি শান্ত গলায় বললাম, ‘ভাই, আমার ফোন বন্ধ ছিল না। আমি বান্দরবানে আছি, এখানে নেটওয়ার্ক থাকে না। আমি ঢাকা ফিরে আপনার সাথে এ বিষয়ে কথা বলব।’
আমার কথা শুনে সে যেন আরও তেলে বেগুনে ছ্যাঁত করে উঠলো। চরম আক্রোশ নিয়ে বলল, ‘বদদোয়া দিলাম! আল্লাহ আপনার ওপর গজব ফেলুক! আপনি যেন ওখান থেকে আর ফিরতে না পারেন! আপনি আমার আনন্দ নষ্ট করে দিয়েছেন!’
অপরিচিত একটা মানুষের এই ভয়ংকর অভিশাপ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। আর টুঁ শব্দটিও না করে চুপচাপ কলটা কেটে দিলাম।
বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। আমি পাহাড় থেকে সুস্থভাবেই ফিরেছি, কোন গজব আমার ওপর পড়েনি। জীবনের ব্যস্ততায় ওই গায়কের কথাও ভুলে গিয়েছি।
হঠাৎ একদিন আমার ফোনে আবার সেই নম্বর। কল ধরতেই ওপাশ থেকে গায়ক সাহেবের গলা ভেসে এল। গলায় অদ্ভুত এক আহ্লাদ, যেন আমরা কত-শত বছরের পরিচিত! ‘ভাই, একটা প্রয়োজনে ফোন দিয়েছি। তবে আপনার মুখ থেকে আমি ‘না’ শুনতে চাই না, বরং ‘হ্যাঁ’ শুনতে চাই।’ আমি চরম কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী প্রয়োজন?’
সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘ভাই, আমার একটা বিলাতি কুত্তা পালার খুব শখ। একটা কুকুর পছন্দও করেছি, কিন্তু কিছু টাকা শর্ট পড়ছে। আপনি আমাকে কিছু টাকা ধার দেন।’
দোকানে বাকি দেওয়া আর মানুষকে ধার দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমার বেশ তিক্ত। টাকা ধার দিলে মানুষের চাকরি চলে যায়, মা অসুস্থ থাকে, ব্যবসা খারাপ যায়, বাবা হাতখরচ দেয় না, গার্লফ্রেন্ড প্যারা দেয়—এমন হাজারটা অজুহাত শুনতে হয় টাকা ফেরতের সময়। এসব তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে আমি তাকে সাফ জানিয়ে দিলাম, ‘ভাই, আমি এখন আর কাউকে টাকা ধার দেই না।’
আমার কথা শুনে ওপাশ থেকে সে মুহূর্তের জন্যও থামল না। নির্লজ্জের মতো বলে বসল, ‘আচ্ছা, ধার দিতে হবে না। তাইলে এমনিতেই ধার ছাড়া টাকাটা দিয়ে দেন!’
আমি ফোনটা কান থেকে নামিয়ে স্ক্রিনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। আমার কানে তখনো তার অভিশাপের কথাটা বাজছে— ‘আল্লাহ আপনার ওপর গজব ফেলুক!’ আর আজ সেই লোকই কিনা আমার কাছে বিলাতি কুকুরের জন্য টাকা চাইছে, তাও আবার দান হিসেবে!
মুরাদ কিবরিয়ার ‘নিনাদ’ উপন্যাসের সেই কুফা রশিদের কথা আমার আবারও মনে পড়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখলাম। রশিদের সেই দর্শনটা সত্যিই এক অমোঘ সত্য। ‘মানুষ আসলে মাদারচোদ।’ না, মানুষ আসলে মাদারচোদ না। তবে—
‘কিছু মানুষ… আসলেই মাদারচোদ।’





