কখনো-সখনো মনে হয়, জীবনটা যদি কোড লেখা কোনো প্রোগ্রাম হতো—তাহলে হয়তো বেঁচে থাকা অনেক সহজ হয়ে যেত।
মনের ভেতর যেসব অপ্রয়োজনীয় ফাইল জমে আছে—পুরোনো কষ্ট, ভুল মানুষের স্মৃতি, হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া কোনো অপমান, রাত জেগে কান্না করা কিছু দিন—সবকিছু সিলেক্ট করে একবারে Shift + Delete দিয়ে মুছে ফেলতাম।
তারপর আর কোনো রিসাইকেল বিনে রাখতাম না। একেবারে স্থায়ীভাবে ডিলিট।
মন খারাপের স্মৃতি? ডিলিট।
ব্যর্থতার গ্লানি? ডিলিট।
অপূর্ণতার বেদনা? সেটাও ডিলিট।
তারপর জীবনটাকে নতুন করে রিস্টার্ট দিতাম। আর পেয়ে যেতাম একেবারে একটা পরিষ্কার অপারেটিং সিস্টেম—যেখানে পুরোনো কোনো বাগ নেই, জমে থাকা কোনো ক্যাশ নেই, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকা কোনো দুঃখের প্রসেসও নেই।
কী সুন্দরই না হতো, তাই না?
ইচ্ছেমতো নিজের মধ্যে নতুন নতুন ফিচার ইনস্টল করতাম। একটা সাহসের প্লাগইন। একটা আনন্দের প্লাগইন। একটা ভালোবাসার এক্সটেনশন। আর কখনোই যেন নিজেকে ভুলে না যাই, তার জন্য একটা রিমাইন্ডারও রেখে দিতাম।
আর যদি কখনো কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতাম? চিন্তার কিছু ছিল না। Ctrl + Z তো আছেই। মাত্র একটা ক্লিকেই ফিরে যেতাম আগের অবস্থায়।
যদি কাউকে ভুল কিছু বলে ফেলতাম, সাথে সাথে আনডু। যে মানুষটাকে বিশ্বাস করা উচিত হয়নি, সেটাও আনডু। যে পথে হাঁটতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম কিংবা যে পথে যাওয়া উচিত হয়নি, সেখান থেকেও Ctrl + Z দিয়ে ফিরে আসা যেত।
কেউ কষ্ট দিলে তাকে সাথে সাথে ডিএকটিভ করে পার্মানেন্টলি ডিলিট করে মনের ভেতর থেকেও সরিয়ে দিতে পারতাম। কোনো অভিজ্ঞতা ভালো না লাগলে ডিএক্টিভ করে আনইনস্টল করে দিতাম। আবার নতুন কিছু চাইলে মুহূর্তেই ডাউনলোড করে নিতাম—সুখ, আনন্দ, শান্তি, ভালোবাসা, স্বপ্ন ইত্যাদি। সবই এক ক্লিকের ব্যবধানে পাওয়া যেত।
তখন জীবনটা পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকত। ইচ্ছেমতো সাজানো, নিজের পছন্দমতো কাস্টমাইজ করা এক আদর্শ সফটওয়্যার। যেখানে কোনো সীমাবদ্ধতা থাকতো না। থাকতো না কোনো অনুশোচনা, কোনো হারিয়ে ফেলার ভয়।
কিন্তু,
কিন্তু জীবন তো আসলে কোনো প্রোগ্রাম না। এখানে নেই কোনো ডিলিট অপশন। নেই কোনো রিস্টার্ট বাটন। সবচেয়ে বড় কথা, এখানে কোনো আনডু নেই।
এখানে একটা মুহূর্ত একবারই আসে। একটা মানুষ একবারই জীবনে ঢোকে। কোনো প্রতিটা সময় একবারই আমাদের সামনে দাঁড়ায়। তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু স্মৃতির ভেতর চলে যায়।
তখন আমরা চাইলে ভুলগুলো মুছে ফেলতে পারি না। চাইলেও সময়কে থামিয়ে রাখতে পারি না। চাইলেও নিজের ভেতরের সব ক্লান্তি রিসেট করা যায় না। এখানে স্মৃতিরা থেকে যায়। চুপচাপ। মনের কোনায় কোনো এক ফোল্ডারে।
আর সেটা কখনো-সখনো হঠাৎ খুলে যায়—কোনো গান শুনে, কোনো রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে, কারো নাম দেখে। কিংবা আবার কখনো-সখনো কোনো কারণ ছাড়াই।
তবুও, অদ্ভুত ব্যাপার কী জানেন?
হয়তো এই ডিলিট না করতে পারার মধ্যেই জীবনের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। কারণ ভুলগুলো না থাকলে আমরা শিখতাম কীভাবে? কষ্ট না থাকলে বুঝতাম কীভাবে, শান্তি আসলে কত দামি? হারিয়ে ফেলা না থাকলে ধরে রাখার মূল্যটাই বা জানতাম কীভাবে?
জীবন কোনো পারফেক্ট সফটওয়্যার না। এটা মাঝেমধ্যে হ্যাং করে। কখনো অকারণে স্লো হয়ে যায়। কখনো পুরোনো ফাইলের ভারে ক্লান্ত লাগে। কখনো-সখনো মনে হয়, সবকিছু নতুন করে শুরু করা দরকার। কিন্তু, তা আর কখনোই সম্ভব হয় না…
তবুও জীবন চলতে থাকে।
রিস্টার্ট ছাড়াই।
আনডু ছাড়াই।
ডিলিট ছাড়াই।
যেখানে পরের লাইনে কী লেখা আছে, তিনি ছাড়া আমরা কেউ তা জানি না।





