মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | ০৩:৪৫:৩৫ পূর্বাহ্ণ
আমার সাথে যুক্ত থাকুনXin

হাটের দিন

ভোরের আলো তখনো পুরো ফোটেনি। কাঁচা রাস্তার ধুলোয় ভ্যানের চাকার দাগ, আর সেই দাগ ধরে এগিয়ে চলেছে সারি সারি মানুষ। কারো মাথায় ঝুড়ি ভরা সকালের সবজি, কারো ভ্যানে বাঁধা মুরগির খাঁচা। মাঠের এক কোণে তখনো শিশির লেগে আছে ঘাসে। কিন্তু মাঠটা আর খালি নেই — বাঁশের খুঁটি পুঁততে শুরু করেছে কেউ, কেউ টাঙিয়ে দিচ্ছে ত্রিপল। আজ হাটের দিন।

গ্রামের সপ্তাহের একটা নিজস্ব ছন্দ আছে। সেই ছন্দের সবচেয়ে জোরালো তালটা বাজে হাটের দিনে। শহরে সপ্তাহ মানে অফিস আর ছুটির হিসাব। গ্রামে সপ্তাহ মানে কোন দিন কোন হাট বসবে, সেই হিসাব। মানুষ মুখস্থ জানে — সোমবার ওই গ্রামের হাট, বৃহস্পতিবার এই গ্রামের। হাটবার এলে ঘরের কাজের তালিকাটাও বদলে যায়। যা যা কিনতে হবে, যা যা বেচতে হবে, সব জমে থাকে ওই একটা দিনের জন্য।

হাট আর বাজার এক জিনিস নয়। বাজার রোজ বসে, তার দোকানগুলো পাকা, বিক্রেতা চেনা। হাট বসে সপ্তাহে একদিন বা দুদিন, খোলা মাঠে, নদীর ধারে, কখনো বড় কোনো বটগাছের ছায়ায়। হাটের দিনে আশপাশের গ্রামগুলো থেকে মানুষ এসে এক জায়গায় জড়ো হয়। তাই হাট বড় হয়, আওয়াজ বড় হয়, আর কেনাবেচার পরিধিটাও বড় হয়। বাজারে যা মেলে না, হাটে তা মেলে।

হাটের সকালটা শুরু হয় তাড়াহুড়ো দিয়ে। কৃষক ভোরে ক্ষেত থেকে তুলে আনা সবজি নিয়ে আসে — পাতায় তখনো ভোরের শিশির লেগে থাকে। মাছের আড়তে বরফের গন্ধ, মসলার দোকানে শুকনো লঙ্কার ঝাঁজ। দরদাম এখানে নিয়মের অংশ। কোনো জিনিসের দাম লেখা থাকে না, দাম ঠিক হয় কথায় কথায়। ক্রেতা একটা দাম বলে, বিক্রেতা হাসে, আবার একটা দাম বলে। এই টানাটানির ভেতরে একটা সম্পর্ক তৈরি হয় — পরের সপ্তাহে আবার দেখা হবে, এই ভরসাটা দুজনেরই থাকে।

কিন্তু হাটে গেলে বোঝা যায়, সেখানে শুধু কেনাবেচা হয় না। হাট আসলে গ্রামের মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা হওয়ার একটা উপলক্ষও বলা চলে। চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে দুজন মানুষ কত রকমের কথা বলে। কার জমিতে ধান কেমন হয়েছে, কার ছেলে শহর থেকে কবে বাড়ি ফিরবে, কোন বাড়িতে বিয়ের আয়োজন চলছে—এমন কত খবর যে এক কাপ চায়ের সঙ্গে আদান-প্রদান হয়, তার হিসাব নেই।

যাদের সঙ্গে সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে দেখা হওয়ার সুযোগ হয় না, হাটের দিন তাদের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। কখনো পুরোনো কোনো বন্ধুকে বাজারের ভিড়ে দেখতে পাওয়া যায়, কখনো কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গল্প জমে ওঠে। হয়তো দেখা করতে আসার কোনো পরিকল্পনা ছিল না, তবু দেখা হয়ে যায়। তারপর প্রয়োজনীয় কেনাকাটা শেষ হলেও বাড়ি ফেরার তাড়া থাকে না। পরিচিত কারও সঙ্গে দুটো কথা বলতে বলতে কখন যে সময় চলে যায়, বোঝাই যায় না।

হাট আর বাজার

ভূগোলের বইয়ে হাটের একটা সরল সংজ্ঞা আছে — সপ্তাহে এক বা দুই দিন বসে এমন বাজার। আর রোজ বসে এমন বাজারকে বলে প্রাত্যহিক বাজার। বাস্তবে পার্থক্যটা আরো জীবন্ত। বাজারে গেলে আপনি দোকানদারের কাছে যান। হাটে গেলে দোকানদার আপনার কাছে আসে — দূরের গ্রাম থেকে, নৌকায়, ভ্যানে, সাইকেলে। তাই হাটের দিনে একটা গ্রামের চেহারা বদলে যায়। সকালের ফাঁকা মাঠ দুপুরের মধ্যে ভিড়ে ভরে ওঠে। দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভিড় সবচেয়ে বেশি থাকে। তারপর আস্তে আস্তে মাঠ ফাঁকা হতে থাকে। রাত নামলে হাট আর থাকে না — থাকে শুধু চাপা ঘাস আর কিছু ছেঁড়া কাগজ।

হাটের আরেকটা দিক হলো তার বিশেষায়িত রূপ। সব হাট একরকম নয়। কোনো হাট বিখ্যাত তার কাপড়ের জন্য, কোনো হাট মাছের জন্য, কোনো হাট গরুর জন্য। পাবনার শরৎনগরের হাট যেমন পশুর হাট হিসেবে পরিচিত — শনি ও বুধবার সেখানে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়ার বেচাকেনা চলে। মৌলভীবাজারের ধোবারহাট-শমসেরগঞ্জ বাজারে সোম ও বৃহস্পতিবার মানুষ আসে হাইল হাওরের তাজা মাছ আর টিলাভূমির বাংলা পানের জন্য। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসেবে প্রতি হাটবারে সেখানে ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ লাখ টাকার বেচাকেনা হয়। একশো বছরের বেশি পুরনো এই হাটের বয়সটাই বলে দেয়, হাট কতটা গভীরে শেকড় গেড়েছে।

করটিয়ার কাপড়ের হাট

বাংলাদেশের হাটগুলোর মধ্যে করটিয়ার নামটা আলাদা করে মনে রাখতে হয়। টাঙ্গাইল শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে, প্রায় দুইশো বছরের পুরনো এই হাট দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাইকারি কাপড়ের হাট বলে পরিচিত। করটিয়ার জমিদার পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায়, আনুমানিক ১৮০০ সালের দিকে এর শুরু। তখন এটা ছিল কৃষকের শস্য, গবাদিপশু আর তাঁতের কাপড় বেচাকেনার ছোট বাজার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটাই হয়ে উঠল টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি বিক্রির প্রধান কেন্দ্র।

আজ করটিয়ার হাট বসে সপ্তাহে দুই দিন — মঙ্গলবার দুপুর থেকে শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলে। পাইকারি বেচাকেনা হয় প্রথম দুই দিন, খুচরা বিক্রি বৃহস্পতিবার। ব্যবসায়ীদের হিসেবে প্রতি সপ্তাহে এখানে প্রায় ত্রিশ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। টাঙ্গাইল শাড়ির পাশাপাশি মেলে চাদর, লুঙ্গি, গামছা, থ্রি-পিস, শীতের কাপড়। এখান থেকে শাড়ি যায় ঢাকার শপিং মল পর্যন্ত। কিন্তু হাটের ভেতরের চিত্রটা মলের মতো নয় — এখানে কাপড়ের গাঁট খুলে দেখা হয়, হাতে ছুঁয়ে দেখা হয়, দরদাম চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

করটিয়ার গল্পের উল্টো পিঠও আছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সুতা আর শ্রমের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক তাঁত ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে, দশ বছর আগের মতো জমজমাট ভাব আর নেই। এই কথাটা শুধু করটিয়ার নয় — পুরনো অনেক হাটেরই। শহরের দোকান আর সুপারশপ এসে হাটের কিছু বাণিজ্য নিয়ে গেছে। শহুরে ক্রেতা এখন হাটে যায় কম। কিন্তু গ্রামে হাট এখনো অপরিহার্য। কারণ ছোট কৃষক সরাসরি ক্রেতার কাছে বেচতে পারে এখানে, মাঝখানে আর কেউ থাকে না। সকালে ক্ষেত থেকে তোলা সবজি দুপুরে হাটের ঝুড়িতে — এই সরাসরি পথটা আর কোথাও এত সহজে মেলে না।

নদীর ধারের হাট

নদী যেখানে জীবনের রাস্তা, হাট সেখানে নদীর ধারেই বসে। ডেমরার জামদানি হাটের কথা ধরা যাক — বালু নদীর ধারে, প্রতি শুক্রবার ভোর পাঁচটা থেকে সকাল নয়টা পর্যন্ত চলে এই হাট। রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ, সিদ্ধিরগঞ্জের জামদানি তাঁতিরা এখানে শাড়ি নিয়ে আসেন। দুইশো থেকে সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো বলে অনুমান করা হয় এই হাটকে। ভোরের হাটের একটা আলাদা মেজাজ আছে — আলো ফোটার আগেই বেচাকেনা শেষ, তাঁতিরা বাড়ি ফেরে দিনের আলো থাকতে থাকতে।

আর চরের হাটগুলো আরো অস্থায়ী। কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্রের চরে, যেখানে পাকা রাস্তা নেই, স্থায়ী বাজার নেই, সেখানে নদীর ধারে ভেসে ওঠে অস্থায়ী হাট। নদী ভাঙলে হাটের জায়গা বদলে যায়, নতুন চর জাগলে হাট সেখানে সরে যায়। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট আর রংপুর মিলিয়ে ছয়শো পঞ্চাশের বেশি চর আছে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা আর দুধকুমার নদীতে, আর সেই চরগুলোকে সেবা দেয় মাত্র আঠারো থেকে বিশটি চরের বাজার। চরের কৃষকরা এখানে ফসল বেচে মূল ভূখণ্ডের চেয়ে কম দামে, আর কিনতে হয় বেশি দামে। এটা হাটের সুন্দর দিক নয়, কঠিন দিক। কিন্তু হাট না থাকলে এই মানুষগুলোর ফসল বেচার জায়গাই থাকত না।

সীমান্তের হাট আবার অন্য গল্প। ২০১০ সালে বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে চুক্তি হয় সীমান্ত হাট খোলার। ২০১১ সালের ২৩ জুলাই প্রথম সীমান্ত হাট চালু হয়। এখন চারটি সীমান্ত হাট চালু আছে — দুটি মেঘালয় সীমান্তে, দুটি ত্রিপুরা সীমান্তে। সেখানে দুই দেশের মানুষ সপ্তাহে এক বা দুই দিন কেনাবেচা করে, দুই দেশের মুদ্রাতেই। একসময় বিভাজনের আগে এসব এলাকায় হাট ছিল, পরে বন্ধ হয়ে যায়, তারপর আবার চালু হয়। বালিয়ামারি-কালাইচর হাট বসে প্রতি বুধবার, জিনজিরাম নদীর ধারে। এখানে বাণিজ্যের অঙ্ক বড় নয়, কিন্তু সীমান্তের দুই পাশের মানুষের পুরনো যোগাযোগটা টিকে আছে হাটের ওপর ভর করে।

হাট নিয়ে লোকসাহিত্যেও কম কথা নেই। রাঢ় অঞ্চলের ছড়া আর ধাঁধায় হাট বারবার ফিরে এসেছে — কোন ধাঁধার উত্তর হাট, কোন ছড়ায় হাট থেকে শাড়ি কেনার স্বপ্ন। এ থেকে বোঝা যায়, হাট শুধু অর্থনীতির ব্যাপার ছিল না কোনোদিন। এটা ছিল গ্রামের সামাজিক জীবনের কেন্দ্র, যেখানে খবর বিনিময় হতো, দেখা হতো, গল্প হতো। গবেষকরা বলেন, হাট কেবল পণ্য বিনিময়ের জায়গা নয়, উৎসব আর সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানেরও জায়গা।

হাটের খাবারের দোকানগুলো আলাদা করে মনে রাখার মতো। গরম জিলাপি ভাজা হয় কড়াইতে, পাশে মুড়ি আর বাতাসা। কেউ কিনছে সদ্য কাটা গরুর মাংস, কেউ বসেছে চায়ের দোকানে — চায়ের সঙ্গে চলে পেঁয়াজি আর পুরি। এই খাবারগুলো রেস্টুরেন্টের মেন্যুতে পাওয়া যায় না, এদের স্বাদ হাটের ধুলো আর ভিড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। একটা হাটের খাবারের দোকান চিনে রাখে মানুষ — পরের সপ্তাহে আবার সেই দোকানেই বসবে, এটা প্রায় ঠিক করা থাকে।

একটা সময় ছিল, যখন হাটে মেয়েদের যাওয়া প্রায় ছিল না বললেই চলে। পুরনো ধাঁধাগুলোতে তার ছাপ আছে। এখন ছবিটা বদলেছে। হাটে এখন মেয়েরাও আসে — কেউ কিনতে, কেউ বেচতে। শাড়ির দোকানে, সবজির ঝুড়ির পাশে, চায়ের দোকানের ধারে — মেয়েদের উপস্থিতি এখন হাটের স্বাভাবিক দৃশ্য। শিশুরা আসে বাবার হাত ধরে, তাদের চোখ থাকে খেলনার দোকানে আর মিষ্টির থালায়। হাটের দিনটা তাদের কাছে উৎসবের মতো।

উৎসবের মৌসুমে হাটের চেহারা আরো বদলে যায়। ঈদের আগে করটিয়ার মতো কাপড়ের হাটে ভিড় এত বেড়ে যায় যে বেচাকেনার অঙ্ক কয়েকশো কোটি টাকায় পৌঁছায় বলে শোনা যায়। নতুন জামার খোঁজে মানুষ দূর দূর থেকে আসে। এই সময়টায় হাট শুধু প্রয়োজন মেটায় না, আনন্দও দেয় — নতুন কাপড়ের গন্ধ, ভিড়ের আওয়াজ, দরদামের হাসি। বছরের বাকি সময় হাট যতটা কাজের জায়গা, উৎসবের সময় ততটাই মিলনমেলার জায়গা।

দিনের শেষে হাট ভাঙে ধীরে ধীরে। বিক্রেতারা গাঁট বাঁধে, ভ্যানে তোলে ঝুড়ি। চায়ের দোকানের শেষ কাপ চা ঠান্ডা হয়। মাঠে পড়ে থাকে চাপা ঘাসের দাগ — সেখানে সকালে যে ভিড় ছিল, সন্ধ্যায় তার চিহ্ন ছাড়া কিছু নেই। পরের সপ্তাহে একই দিনে আবার বাঁশের খুঁটি পুঁততে আসবে কেউ। হাটের দিনটা চলে যায়, কিন্তু তারিখটা মনে থেকে যায় — কারণ গ্রামের সপ্তাহ ঘোরে ওই একটা দিনকে কেন্দ্র করেই।

শেয়ার করুন:ftinX