আমার সাথে যুক্ত থাকুন___

ভালোবাসার দর্শন

|
4 মিনিটে পড়ুন
ভালোবাসার দর্শন

ভালোবাসা খুব অদ্ভুত একটা জিনিস। যখন থাকে, তখন মনে হয়—এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি। মানুষ  তখন  এমন সব কাজ করে ফেলে, যা সে নিজের জন্য কোনোদিনও করতে পারত না। আবার যখন সেই ভালোবাসা একটু দূরে সরে যায়, তখন বোঝা যায়—এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অসহায়ত্ব। যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেও নিজের ভেতরে এক বিশাল শক্তি অনুভব করছিল, সেই মানুষটাই হঠাৎ করে ভীষণ নিরুপায় হয়ে পড়ে।

হয়তো এই কারণেই ভালোবাসা কখনো একা আসে না। সে নিজের সঙ্গে আরও কিছু অনুভূতি নিয়ে আসে। কখনো আনন্দ, কখনো অপেক্ষা, কখনো অকারণ হাসি, কখনো আবার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা। যেন ভালোবাসা একা কোনো অনুভূতির নাম নয়; সে যেন অনেকগুলো অনুভূতির একসঙ্গে বেঁচে থাকার নাম।

এইসব ভাবতে ভাবতেই আমার মাঝে মাঝে একটি অদ্ভুত কথা মনে হয়। ভালোবাসার বাবা বোধহয় ঐশ্বর্য। আর মা হলেন অভাব

ঐশ্বর্য মানে শুধু ধন-সম্পদ নয়। ঐশ্বর্য মানে শক্তি, সামর্থ্য, সাহস। একটা মানুষ যখন সত্যিকার অর্থে ভালোবাসতে শেখে, তখন তার ভেতরে এমন কিছু জন্মায়, যা আগে ছিল না। সে হঠাৎ করেই সাহসী হয়ে ওঠে। যে মানুষ নিজের জন্য কোনোদিন লড়তে পারেনি, সে অন্য একজন মানুষের একটি হাসির জন্য পুরো পৃথিবীর সঙ্গে লড়াই করে ফেলে।

তখন মনে হয়, এই শক্তি কোথা থেকে আসে? এই শক্তির উৎস কোথায়?

হয়তো ভালোবাসার ভেতরেই।

ভালোবাসা মানুষকে বড় করে। হৃদয়কে বড় করে। পৃথিবীকে বড় করে। তখন নিজের সুখের চেয়ে অন্য একজন মানুষের সুখ বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। নিজের ক্লান্তি ভুলে গিয়ে কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে পারে। রাত জেগে থাকতে পারে। শুধু এই বিশ্বাসে—মানুষটা ভালো থাকুক।

এই শক্তি সাধারণ কোনো শক্তি নয়। তাই মনে হয়, ভালোবাসার বাবা সত্যিই ঐশ্বর্য। কিন্তু  তার তো আরেকটি পরিচয়ও আছে। তার মা—অভাব

শুনতে অদ্ভুত লাগে। অথচ জীবনের দিকে একটু তাকালেই কথাটা বুঝতে পারা যায়। যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো, তাকে কি কোনোদিন পুরোপুরি পাওয়া যায়?

একসঙ্গে সারাদিন কাটানোর পরও মনে হয়, আহা, আরেকটু যদি থাকত! অনেক কথা বলার পরও মনে হয়, সবচেয়ে জরুরি কথাটাই বলা হলো না। হাজারবার দেখা হওয়ার পরও মনে হয়, আরেকবার দেখা হলে ভালো হতো।

ভালোবাসা কখনো মানুষকে তৃপ্ত হতে শেখায় না। সে শুধু ‘আরও একটু’ চাওয়া শেখায়। এই চাওয়ার কোনো শেষ নেই।

প্রথমে মানুষ একটি হাসি চায়। তারপর একটু সময়। তারপর একটু যত্ন। তারপর আরও কিছু স্মৃতি। তারপর আরও কিছু ভবিষ্যৎ। মজার ব্যাপার হলো, যত বেশি পাওয়া যায়, তত বেশি চাওয়া জন্মায়। কারণ ভালোবাসা হিসাব জানে না। সে শুধু অনুভব করতে জানে।

একসময় এই চাওয়ার সঙ্গে এসে যোগ দেয় আরেকটি অনুভূতি—হারিয়ে ফেলার ভয়। এই ভয় খুব শব্দ করে আসে না। নিঃশব্দে এসে মানুষের ভেতরে বসে থাকে।

হঠাৎ ফোন না এলে মন অস্থির হয়ে যায়। কোনো কারণ ছাড়াই মনে হয়, সব ঠিক আছে তো? মানুষটা দূরে সরে যাচ্ছে না তো?

অন্য কেউ হয়তো বলবে, এগুলো অকারণ চিন্তা। কিন্তু যে ভালোবাসে, সে জানে—এই অকারণ চিন্তারও একটা গভীর কারণ আছে। কারণ ভালোবাসা হারাতে ভয় পায়।
আমরা সবাই আসলে হারাতে ভয় পাই।

একটা সম্পর্ক, একটা মানুষ, একটা অভ্যাস, একটা ডাক—সবকিছু হারানোর ভয় আমাদের ভেতরে নীরবে বাস করে। আর এই ভয়টাই প্রমাণ করে, আমরা এখনও ভালোবাসি।

যেদিন আর হারানোর ভয় থাকবে না, সেদিন হয়তো সম্পর্ক থাকবে, কথা হবে, দেখা হবে। কিন্তু ভালোবাসা আর আগের মতো থাকবে না।

কারণ ভালোবাসা কখনো নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকতে পারে না। সে অপেক্ষা করতে ভালোবাসে। সে পথ চেয়ে থাকতে ভালোবাসে। সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে দেখতে ভালোবাসে। সে জানে, সব পাওয়া হয়ে গেলে গল্প শেষ হয়ে যায়।

জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো কখনো পূর্ণ হয় না। একটু অপূর্ণতা থেকেই যায়। সেই অপূর্ণতাই গল্পকে বাঁচিয়ে রাখে। হয়তো এ কারণেই আমরা পুরোনো চিঠি ফেলে দিতে পারি না। পুরোনো ছবি দেখলে হঠাৎ চুপ হয়ে যাই। কোনো পরিচিত গান শুনলে অনেক বছর আগের একটি বিকেল ফিরে আসে।

ভালোবাসা চলে যায় না। সে শুধু রূপ বদলায়। কখনো স্মৃতি হয়। কখনো অপেক্ষা হয়। কখনো দীর্ঘশ্বাস হয়ে বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকে। আর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল বোধহয় আমরা তখনই করি, যখন ভাবি—একদিন সব পেয়ে যাব।

মানুষ কোনোদিন সব পায় না। হয়তো পাওয়ার জন্যই মানুষ জন্মায়নি। হয়তো মানুষ জন্মেছে ভালোবাসার জন্য। আর ভালোবাসা জন্মেছে একটু না-পাওয়া নিয়ে।
তাই যার জীবনে ভালোবাসা আছে, তার জীবনে অভাবও থাকবে। কখনো সময়ের অভাব, কখনো দূরত্বের অভাব, কখনো স্পর্শের অভাব, কখনো একটি কথার অভাব, কখনো আরো অনেক কিছুর অভাব।

আর এই অভাবই তোমাকে বারবার মনে করিয়ে দেবে—তুমি এখনও অনুভব করতে পারো। এখনও কারও জন্য অপেক্ষা করতে পারো। এখনও একজন মানুষের চলে যাওয়ার কল্পনায় তোমার বুক কেঁপে ওঠে।

যতদিন এই অনুভূতি থাকবে, ততদিন ভালোবাসাও থাকবে। তাই আজ মনে হয়, ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পরিচয় তার প্রাপ্তিতে নয়, তার অপূর্ণতায়। ঐশ্বর্য তাকে শক্তি দিয়েছে, অভাব তাকে গভীরতা দিয়েছে। আর এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়েই মানুষ সারাজীবন ভালোবাসতে শেখে।

শেয়ার করুন:

সব হারিয়ে যাওয়ার পরও মানুষ বেঁচে থাকে—এটাই জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত সৌন্দর্য...

___মুসাইব

আমার সম্পর্কে

Picture of ছফওয়ান আল মুসাইব

ছফওয়ান আল মুসাইব

আমি ছফওয়ান আল মুসাইব। গল্পের ভেতর মানুষ খুঁজি, আর মানুষের ভেতর গল্প। ছোটবেলা থেকেই আমি গল্পের প্রতি দুর্বল। কখনো বইয়ের...

সোশ্যাল মিডিয়া