একটা সময় ছিল, যখন কারও খোঁজ নিতে হলে তার বাড়িতে যেতে হতো। দূরে থাকলে চিঠি লিখতে হতো। একটা চিঠির উত্তর আসতে কখনো কখনো সপ্তাহ কেটে যেত, কখনো বা মাস। তবুও মানুষ অপেক্ষা করত। সেই অপেক্ষার মধ্যে ছিল আন্তরিকতা, ছিল টান, ছিল সম্পর্কের উষ্ণতা।
আজ পৃথিবী বদলে গেছে।
এখন কাউকে খুঁজে পেতে কয়েক সেকেন্ডও লাগে না। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম—সব মিলিয়ে আমরা যেন একে অপরের নাগালের মধ্যেই আছি। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বসে মুহূর্তের মধ্যেই কথা বলা যায়, ছবি পাঠানো যায়, অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া যায়।
তবুও এই অবিরাম সংযোগের যুগে এক ধরনের নীরব বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা যায়, বিশ্বের বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়মিত একাকীত্ব অনুভব করে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই অনুভূতি আরও বেশি।
বিষয়টা প্রথম শুনলে হয়তো অদ্ভুতই লাগে। কারণ একাকী তো তারাই হওয়ার কথা, যাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নেই। অথচ আজ আমাদের হাতে স্মার্টফোন আছে, ইন্টারনেট আছে, সোশ্যাল মিডিয়া আছে। বন্ধুদের খবর জানতে বাড়িতে যেতে হয় না, চিঠি লিখতে হয় না, অপেক্ষা করতে হয় না। তাহলে এই একাকীত্ব আসে কোথা থেকে?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই।
ধরুন, কোনো রেস্টুরেন্টে চারজন বন্ধু একসঙ্গে বসেছে। টেবিলে খাবার আছে, গল্প করার সুযোগ আছে। কিন্তু কয়েক মিনিট পর দেখা গেল সবাই নিজের নিজের ফোনে ব্যস্ত। কেউ রিলস দেখছে, কেউ স্টোরি আপলোড করছে, কেউ আবার অন্য কারও পোস্টে মন্তব্য করছে।
কিংবা, পরিবারের সবাই একই ঘরে বসে আছে। কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছে না। একজন ফোনে ভিডিও দেখছে, একজন স্ক্রল করছে, আরেকজন কারও স্টোরি দেখছে। সবাই একসাথে থেকেও যেন আলাদা আলাদা জগতে বাস করছে।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তারা পাশাপাশি বসে আছে ঠিকই, কিন্তু তাদের মন একসঙ্গে নেই। শারীরিকভাবে কাছে থেকেও তারা যেন একে অপরের থেকে দূরে।
আবার এমনও দেখা যায়, একজন মানুষের সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজার হাজার বন্ধু আছে। তার ছবিতে শত শত রিঅ্যাকশন পড়ে। জন্মদিনে অসংখ্য শুভেচ্ছা আসে। কিন্তু মন খারাপের কোনো রাতে যখন সত্যিই কারও প্রয়োজন হয়, তখন ফোন করার মতো একজন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না।
হয়তো কারণ, আমরা অনেক সময় যোগাযোগকে সম্পর্ক ভেবে ভুল করি।
ধরুন, একজন মানুষ তৃষ্ণার্ত। তার শরীরের প্রয়োজন পানি। কিন্তু সে সারাদিন শুধু কোমল পানীয় খেয়ে যাচ্ছে। প্রথমে হয়তো তার ভালো লাগবে। মিষ্টি স্বাদ পাবে। তৃষ্ণাও কিছুক্ষণের জন্য কমে গেছে বলে মনে হবে। কিন্তু শরীর জানে, সে আসলে যা চায়, তা সে পাচ্ছে না।
সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষেত্রেও বিষয়টা অনেকটা এমন। লাইক, রিঅ্যাকশন, মন্তব্য কিংবা নোটিফিকেশন আমাদের সাময়িক ভালো লাগা দিতে পারে। কিন্তু মানুষের ভেতরের যে গভীর চাহিদা—বোঝা হওয়া, গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া, কারও সঙ্গে সত্যিকারের সংযোগ তৈরি করা—সেটার বিকল্প এগুলো হতে পারে না।
দেখতে সম্পর্কের মতো, কিন্তু সম্পর্ক নয়। দেখতে যোগাযোগের মতো, কিন্তু সংযোগ নয়। দেখতে বন্ধুত্বের মতো, কিন্তু বন্ধুত্ব নয়। কারণ প্রকৃত সম্পর্ক শুধু একে অপরের খবর জানার মাধ্যমে তৈরি হয় না; তৈরি হয় সময়, উপস্থিতি, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে।
আগে সম্পর্ক গড়ে তুলতে সময় লাগত। কাউকে দেখতে যেতে হতো। অপেক্ষা করতে হতো। ভুল বোঝাবুঝি মিটাতে কথা বলতে হতো। একসঙ্গে সময় কাটাতে হতো।
আজ সেই অপেক্ষা নেই। সুবিধা বেড়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতাও কি কমে যায়নি?
আজ আমরা বন্ধুর জীবনের প্রতিটি আপডেট জানি। সে কোথায় গেল, কী খেল, কার সঙ্গে দেখা করল—সব জানি। কিন্তু শেষ কবে সে কেঁদেছে, শেষ কবে সে ভয় পেয়েছে, শেষ কবে সে নিজেকে অসহায় মনে করেছে—এসব অনেক সময় জানি না। কারণ তথ্য আর সম্পর্ক এক জিনিস নয়।
একাকীত্বের আরেকটি কারণ হলো, সোশ্যাল মিডিয়া শুধু আমাদের যোগাযোগের ধরনই বদলায়নি; বদলে দিয়েছে নিজেদের দেখার পদ্ধতিও।
আমরা এখন অনেক সময় নিজেদের জীবনকে অন্যদের চোখ দিয়ে দেখতে শিখে গেছি। কোথাও ঘুরতে গেলে ছবি তুলতে হয়। ভালো খাবার খেলে ছবি দিতে হয়। নতুন কিছু কিনলে পোস্ট করতে হয়। কখনো কখনো কোনো মুহূর্ত উপভোগ করার আগেই আমরা ভাবতে শুরু করি, সেটি কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরা যায়।
আর তখনই শুরু হয় এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা।
কে বেশি সুখী? কার জীবন বেশি সুন্দর? কার সাফল্য বেশি? কার ভ্রমণ বেশি? কার সম্পর্ক বেশি নিখুঁত?
কিন্তু সত্যিটা হলো, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা মানুষের পুরো জীবন দেখি না। দেখি শুধু নির্বাচিত কিছু মুহূর্ত।
আমরা হাসির ছবি পোস্ট করি, কিন্তু সেই হাসির পেছনের কান্না পোস্ট করি না। সাফল্যের গল্প শেয়ার করি, কিন্তু ব্যর্থতার রাতগুলো দেখাই না। সুন্দর ভ্রমণের ছবি দিই, কিন্তু ভেতরের শূন্যতা ছবিতে ধরা পড়ে না।
ফলে আমরা অন্যের জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোর সঙ্গে নিজের জীবনের সাধারণ মুহূর্তগুলোর তুলনা করতে শুরু করি। আর এই তুলনা অনেক সময় নিঃসঙ্গতাকে আরও গভীর করে তোলে।
কখনো কি খেয়াল করেছেন? অনেক মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইনে থাকে, অথচ দিনের শেষে মনে হয় তার সঙ্গে সত্যিকার অর্থে কারও কথা হয়নি।
কথা হয়েছে অনেক, কিন্তু আলাপ হয়নি। মেসেজ হয়েছে অনেক, কিন্তু মন খুলে বলা হয়নি। সংযোগ হয়েছে অনেক, কিন্তু সম্পর্ক তৈরি হয়নি।
এখানেই পার্থক্য।
আমাদের মস্তিষ্ক শুধু যোগাযোগ চায় না, চায় বোঝাপড়া। চায় গ্রহণযোগ্যতা। চায় এমন একজন মানুষকে, যার সামনে নিজের দুর্বলতাগুলো লুকাতে হবে না।
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। দূরের মানুষকে কাছে এনেছে। পুরোনো বন্ধুদের খুঁজে দিয়েছে। নিজের কথা প্রকাশ করার সুযোগ দিয়েছে। অনেকের জন্য এটি কাজের জায়গা, শেখার জায়গা, এমনকি জীবিকা অর্জনের মাধ্যমও।
প্রযুক্তি যোগাযোগের পথ সহজ করেছে। কিন্তু সম্পর্কের গভীরতা তৈরি করার দায়িত্ব এখনও মানুষেরই। কারণ প্রযুক্তি মুহূর্তের মধ্যে পরিবারের খোঁজ এনে দিতে পারে কিন্তু পরিবারের সঙ্গে বসে এক কাপ চা খাওয়ার বিকল্প আজও তৈরি হয়নি। আজও কোনো প্রিয় মানুষের পাশে নীরবে বসে থাকার বিকল্প তৈরি হয়নি।
হয়তো তাই আমাদের মাঝে মাঝে স্ক্রিনের বাইরে তাকানো দরকার। কখনো ফোনটা নামিয়ে রাখা দরকার। কখনো কারও পোস্টে লাইক দেওয়ার বদলে তাকে ফোন করা দরকার। কখনো শুধু জিজ্ঞেস করা দরকার—
“কেমন আছো?”





