কিছু ভালোবাসা হয় চুপচাপ—কারও ঘুম ভাঙার আগেই রান্নাঘরে জ্বলে ওঠা মৃদু আলোয়, দরজার পাশে গুছিয়ে রাখা পরিষ্কার জুতায়, কিংবা টেবিলের কোণে ঢেকে রাখা এক কাপ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের মতো, যেটা কেউ বানিয়ে রেখে গেছে—কিন্তু বলে যায়নি, “এটা তোর জন্য।”
এই কথাগুলো আমি আগে বুঝতাম না। কারণ তখন আমার কাছে ভালোবাসা মানে ছিল—প্রকাশ। আমি ভাবতাম—কেউ ভালোবাসলে সেটা প্রকাশ করতে হবে। বারবার বলতে হবে। ফোন করে খোঁজ নিতে হবে। মন খারাপ হলে পাশে বসতে হবে। পরীক্ষার আগে মাথায় হাত রেখে দোয়া করতে হবে। অসুস্থ হলে কপালে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে, ‘খুব কষ্ট হচ্ছে?’
তখন আমার কাছে ভালোবাসার হিসাবটা খুব সহজ ছিল—ভালোবাসা থাকলে তার শব্দ থাকবে, স্পর্শ থাকবে, আদর থাকবে। নইলে সেটা আবার কেমন ভালোবাসা?
কিন্তু আমার বাবা?
তিনি ছিলেন একেবারে অন্যরকম একজন মানুষ। ভালোবাসতেন—কিন্তু প্রকাশ করতেন না। খোঁজ নিতেন—কিন্তু প্রশ্নের ভেতরে আবেগ মেশাতেন না। যত্ন করতেন—কিন্তু কখনো বলতেন না, ‘আমি আছি।’
আর এই না-বলা, না-দেখানো, না-ছোঁয়া ভালোবাসাকেই আমি বহুদিন ভুল নামে ডেকেছি—অবহেলা।
আমার বাবা ছিল কম কথা বলা মানুষ। এমন কম কথা, যে একই ঘরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও তাঁর উপস্থিতি অনেক সময় বোঝা যেত শুধু চশমার ফ্রেম ঠিক করার শব্দে, কিংবা পত্রিকার পাতা ওল্টানোর হালকা খসখস আওয়াজে।
আমার মা মারা যাওয়ার পর মানুষটা আরও চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। আগে অন্তত মাঝে মাঝে হাসতেন। মায়ের সঙ্গে ছোটখাটো তর্ক করতেন। কখনো কখনো রাতে বাজার থেকে ইলিশ এনে দরজায় দাঁড়িয়ে বলতেন, ‘আজ ভালো মাছ পেয়েছি। এখনই কড়া করে সরিষা দিয়ে রান্না করো তো।’ মা তখন বিরক্ত হওয়ার ভান করতেন। বলতেন, ‘এই রাতদুপুরে কার মাছ রান্না করার শখ হলো?’
বাবা কিছু বলতেন না। শুধু একটু হেসে মাছের ব্যাগটা রান্নাঘরে রেখে দিতেন। কিন্তু মা চলে যাওয়ার পর তাঁর সব কথা, তাঁর হাসি যেন কোথাও আটকে গেল।
ক্লাস সেভেনের শেষ পরীক্ষার আগে মা মারা যান। কীভাবে যে পরীক্ষা দিয়েছিলাম, আজও ঠিক মনে নেই। বই খুলতাম, কিন্তু অক্ষরগুলো ঝাপসা লাগত। ফুফিরা মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিত, ‘মানুষ তো আর চিরদিন থাকে না। একদিন তো চলে যেতেই হবে। ভেঙে পড়ো না, শক্ত হও।’ কোনো মতে পরীক্ষা শেষ করে ক্লাস এইটে উঠলাম।
বয়সটা তখন এমন ছিল, যখন মানুষ নিজের কষ্টকেও ঠিকমতো চিনতে পারে না। বুকের ভেতর যে শূন্যতা জমে থাকে, সেটাকেও রাগ বলে ভুল করে। আমিও তাই করেছিলাম। বাবার নীরবতাকে আমি অবহেলা ভেবেছিলাম। মনে করতাম—বাবা আমাকে ভালোবাসেন না। মা থাকলে হয়তো মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, পরীক্ষার আগে দোয়া করতেন, অসুস্থ হলে পাশে বসে থাকতেন। কপালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করতেন, ‘খুব কষ্ট হচ্ছে?’
অথচ বাবা শুধু বলতেন—‘ওষুধ খেয়েছ?’
ব্যস। এর বেশি কিছু না।
একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখি, দরজার পাশে আমার পুরোনো জুতার জায়গায় নতুন এক জোড়া স্কুলের জুতা রাখা। পুরোনো জুতাটার সামনের দিকটা কয়েকদিন ধরেই অল্প একটু ফেটে ছিল। হাঁটলে ডান পায়ের আঙুলটা সামান্য দেখা যেত। কাউকে বলিনি। শুধু আগের দিন স্কুল থেকে ফিরে বিরক্ত হয়ে জুতাটা দরজার পাশে ছুড়ে ফেলেছিলাম। মনে মনে ভেবেছিলাম, মা থাকলে হয়তো প্রথম দিনেই খেয়াল করতেন।
নতুন জুতাটা দেখে বুঝে গেলাম, বাবা কিনে এনেছেন। কিন্তু বাবা কিছু বললেন না। যেন কিছুই হয়নি। যেন এটা খুব সাধারণ একটা ব্যাপার। রাতে খাওয়ার সময় আমি নিজেই জিজ্ঞেস করলাম— জুতাটা তুমি এনেছ?
বাবা ভাত মাখতে মাখতে বললেন—হ্যাঁ।
—কেন?
এখনো মনে পড়ে, বাবা তখন আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর চোখে কোনো বাড়তি আবেগ ছিল না, মুখে কোনো হাসিও না। তারপর আগের মতোই শান্ত গলায় বললেন—লাগবে তো।
তাঁর এই সংক্ষিপ্ত উত্তর শুনে সেদিন আমার খুব রাগ হয়েছিল। শুধু এতটুকু বললেই হলো? একটু কি বলা যেত না—তোর জুতাটা ফেটে গেছে দেখলাম, তাই আনলাম? একটু কি হাসা যেত না? একটু কি মাথায় হাত রেখে বলা যেত না—আগে বলিসনি কেন? সে চুপচাপ খেয়ে উঠে গেল।
এই রকম অনেক ঘটনা ছিল।
প্রতিদিন সকালে আমি ঘুম থেকে উঠে দেখতাম, আমার স্কুলের শার্ট ইস্ত্রি করা। বৃষ্টির দিনে দরজার পাশে ছাতা রাখা। পরীক্ষার দিন ব্যাগে অতিরিক্ত কলম। জ্বর হলে বিছানার পাশে পানি, ওষুধ, আর থার্মোমিটার।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকত। শুধু বাবার মুখে সেই কথাগুলো থাকত না, যেগুলো শুনতে আমার খুব ইচ্ছে করত।
‘আমি আছি।’
‘ভয় পাস না।’
‘তুই আমার ছেলে, আমি তোকে একা ছাড়ব না।’
কিন্তু বাবা এসব বলতেন না।
আর সেই না-বলাটাকেই আমি ভুল বুঝতাম। মনে হতো, তিনি আমাকে ভালোবাসেন না। শুধু অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যেন আমার খাওয়া, পড়া, স্কুল, অসুখ—সবই তাঁর কাছে একটা কর্তব্যের তালিকা। সেখানে মায়া নেই, আবেগ নেই, শুধু নিয়ম আছে।
মানুষের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। আমরা অনেক সময় শব্দকে বেশি বিশ্বাস করি, কাজকে কম। কেউ মুখে “ভালোবাসি” বললে আমরা তাড়াতাড়ি নরম হয়ে যাই। আর কেউ চুপচাপ যত্ন করলে, ভোরে উঠে কেউ আমাদের জন্য নাস্তা বানিয়ে শার্ট ইস্ত্রি করে রাখলে, বৃষ্টির দিনে দরজার পাশে ছাতা রেখে দিলে ভাবি—এটা তো তার করাই উচিত।
আমিও তাই ভেবেছিলাম।
বহুদিন।
কলেজে ওঠার পর বাবার সঙ্গে আমার দূরত্ব আরও বেড়ে গেল। আমি বন্ধুদের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতাম, বাসায় ফিরতাম দেরিতে। বাবা কখনো জেরা করতেন না। কোথায় ছিলাম, কার সঙ্গে ছিলাম, কেন এত রাত হলো—এসব নিয়ে কোনো প্রশ্ন করতেন না। শুধু দরজা খোলার শব্দ শুনলেই নিজের রুম থেকে বলতেন—খেয়েছ?
আমি বিরক্ত গলায় বলতাম—হ্যাঁ, খেয়েছি।
অনেক সময় খায়নি, তবুও বলতাম খেয়েছি। কারণ, ‘না’ বললে বাবা রান্নাঘরে গিয়ে খাবার গরম করা শুরু করবে। আর সেই দৃশ্যটা আমার কাছে তখন অস্বস্তিকর লাগত। কেন জানি মনে হতো, এসব যত্নের ভেতরে কোনো উষ্ণতা নেই, শুধু আছে অভ্যাস আর সামান্য কিছু দায়িত্ব ।
একদিন রাতে আমি খুব দেরি করে বাসায় ফিরলাম। বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি। রাস্তার বাতিগুলো ঝাপসা হয়ে ছিল। গলির মুখে কুকুরগুলো দোকানের ছাউনির নিচে গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিল। বাসায় ঢুকে দেখি, ডাইনিং টেবিলে খাবার ঢাকা। পাশে একটা ছোট কাগজ। ‘ভাত-তরকারি গরম করে খেয়ে নিস। মাছটা কম ঝাল।’
আমি সেদিন কাগজটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। বাবার হাতের লেখা খুব সুন্দর ছিল না। কাঁপা কাঁপা, অসমান। তবু অদ্ভুতভাবে পরিষ্কার।
আমি কাগজটা দুমড়ে-মুচড়ে ডাস্টবিনে ফেলতে গিয়েও ফেললাম না। রুমে গিয়ে ড্রয়ারে রেখে দিলাম। কেন রেখেছিলাম, সেটা নিজেও জানত না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি বড় হলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম শহরে। বাড়ি থেকে দূরে থাকার একটা অদ্ভুত স্বাধীনতা আছে। কেউ রাতে দরজা খুলে অপেক্ষা করে না, কেউ জিজ্ঞেস করে না, “খেয়েছ?” কেউ বৃষ্টির দিনে ছাতা এগিয়ে দেয় না।
প্রথম দিকে এসব ভালোই লাগত আমার। মনে হতো, এটাই জীবন। নিজের মতো থাকা। নিজের মতো খাওয়া। নিজের মতো রাত জাগা। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই আমি বুঝতে পারলাম, স্বাধীনতা সুন্দর, তবে সবসময় উষ্ণ নয়।
মেসের ছোট্ট রুমে রাতে পড়তে বসে কখনো কখনো বাবার কথা খুব মনে পড়ত। বিশেষ করে যখন জ্বর আসত। কিংবা যখন পকেটের টাকা শেষ হয়ে যেত। অথবা যখন কোনো কারণে খুব মন খারাপ থাকত, কিন্তু কাউকে বলার মতো ভাষা খুঁজে পেতাম না।
বাবা ফোন করতেন খুব কম। ফোন করলেও কথাগুলো প্রায় একই রকম হতো।
—কেমন আছিস?
—ভালো।
—টাকা আছে?
—আছে।
—পড়াশোনা ঠিক আছে?
—হ্যাঁ।
তারপর একটু নীরবতা। দুই পাশে দুই মানুষ। দু’জনেরই অনেক কথা আছে, কিন্তু কেউ বলতে পারতাম না।
একদিন মাসের শেষ দিকে আমার হাতে টাকা প্রায় শেষ। বাবাকে জানালাম না। ভাবছিলাম, বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নেব। পরে বাবা পাঠালে তাদের দিয়ে দেব। হঠাৎ সেই রাতেই দেখি বিকাশে টাকা এল। সঙ্গে ছোট্ট মেসেজ—কম পড়ে গেলে জানাবি।
আমি সেদিন সেই ছোট্ট মেসেজটার দিকে অনেকটা সময় তাকিয়ে ছিলাম। আর ভাবছিলাম, আমি তো কিছু জানায়নি। তবু বাবা বুঝলেন কীভাবে? কিন্তু এখন বুঝি, বাবারা আসলে ম্যাজিশিয়ান।
সেই রাতে বাবাকে ফোন করতে চেয়েছিলাম। অনেকক্ষণ স্ক্রিনে ‘বাবা’ নামটা খোলা রেখে বসে ছিলাম। কিন্তু ফোন করা হয়নি।
হয়তো অহংকার ছিল।
হয়তো সংকোচ।
হয়তো এতদিনের দূরত্ব এক মুহূর্তে পেরিয়ে যাওয়ার সাহস ছিল না।
এর কিছুদিন পর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রথমে ফুফিরা ভেবেছিলেন, হয়তো সাধারণ দুর্বলতা। বয়স হয়েছে, শরীর একটু খারাপ—এমন কিছু। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেল, বাবার হার্টের সমস্যা হয়েছে। অবস্থা ভালো না। দ্রুত শহরে এনে ভালো চিকিৎসা করাতে হবে।
খবরটা আমাকে জানানো হল। সেদিন আমি ফোন হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম। ওপাশ থেকে ফুফি বারবার বলছিলেন, ‘তোর বাবারে শহরে নিতে হইব। তুই একবার আয় বাবা।’
আমি জানি না, সেদিন আমার ভেতরে কী হয়েছিল। হয়তো ভয় পেয়েছিলাম। হয়তো এতদিনের দূরত্ব আমাকে পাথর বানিয়ে রেখেছিল। হয়তো নিজের অপরাধবোধের সামনে দাঁড়ানোর সাহস হয়নি। আমি শুধু বলেছিলাম—দেখি। তারপর ফোন রেখে দিলাম।
সেই ‘দেখি’ শব্দটার ভার আমি আজও বয়ে বেড়াই।
ঠিক দু’দিন পর ফুফি আবার ফোন করলেন। ওপাশে কান্নার শব্দ। তারপর খুব ভাঙা গলায় বললেন—তোর বাবা আর নাই।
কথাটা শুনে প্রথমে কিছুই বুঝতে পারিনি। মনে হলো, শব্দগুলো কানে ঢুকেছে ঠিকই, কিন্তু মাথা পর্যন্ত পৌঁছায়নি। কী বলব, কী করব—কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ফোনটা কানে ধরে অনেকক্ষণ বসে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে। মানুষ এভাবে হঠাৎ চলে যায় কীভাবে?
তারপর ছুটলাম বাড়ির দিকে।
বাড়িতে ঢুকতেই আগরবাতির ঘ্রাণে বুকটা কেমন ভারী হয়ে গেল। উঠানভরা মানুষ। কারও মুখে নিচু স্বরের কথা, কারও চোখে পানি, কারও চেহারায় সেই পরিচিত অসহায়তা—যা শুধু মৃত্যুর ঘরে দেখা যায়।
ভিড় ঠেলে সামনে এগোলাম।
সেদিন বাবাকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম। অদ্ভুতভাবে ছোট লাগছিল তাঁকে। যে মানুষটাকে সারাজীবন শক্ত, নির্লিপ্ত, চুপচাপ একটা দেয়ালের মতো দেখেছি—সেই মানুষটা সেদিন নীরব হয়ে শুয়ে ছিলেন। কোনো প্রশ্ন নেই। কোনো সংক্ষিপ্ত উত্তর নেই। কোনো ‘খেয়েছ?’ নেই।
আমি শুধু দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিছু বলতে পারছিলাম না। এখন বারবার মনে হয়, মানুষটা যদি তখন একটাবার চোখ খুলে তাকাতেন, আমি প্রথমবারেই বলতাম—বাবা, আমি ভুল বুঝেছিলাম, আমায় ক্ষমা করে দাও।
কিন্তু কিছু কথা আছে, যা বলার সময় চলে গেলে আর কোনো শব্দই তাকে ফিরিয়ে আনতে পারে না।
কয়েক সপ্তাহ পর বাবার আলমারি গুছাতে গিয়ে একটা পুরোনো টিনের বাক্স পেলাম। বাক্সটা আগে কখনো খেয়াল করেনি। বাক্সটা খুলে দেখি, ভেতরে ছিল কিছু কাগজ, পুরোনো প্রেসক্রিপশন, মায়ের ছবি, আর কয়েকটা ছোট ছোট জিনিস। তার মধ্যে একটা পলিথিনে ভাঁজ করে রাখা অনেকগুলো কাগজ। আমি খুলে দেখলাম। সব আমার জিনিস।
স্কুলের প্রথম পুরস্কারের সার্টিফিকেট। ক্লাস ফাইভের রিপোর্ট কার্ড। কলেজে ভর্তি হওয়ার রসিদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেমিস্টারের ফলাফলের প্রিন্ট কপি। এমনকি ছোটবেলায় আঁকা একটা বেঁকে যাওয়া অসম্পূর্ণ বাড়ির ছবিও ছিল, যেখানে কাঁচা হাতে লিখেছিলাম—আমার পরিবার।
আরও একটা খাম ছিল। খামের ওপর লেখা—রাফির জন্য। আমার বুক ধুক করে কেঁপে উঠল। খামটা খুলে দেখলাম, ভেতরে একটা চিঠি। বাবার হাতের লেখা। সেই চেনা কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা, অসমান অক্ষর। হয়তো অনেকদিন আগেই লিখেছিলেন, কিন্তু হয়তো কখনো আমাকে দেওয়ার সাহস হয়নি।
চিঠিতে লেখা—
“বাবা,
আমি জানি, আমি কথা বলতে পারি না। তোর মায়ের মতো তোকে আগলে রাখতে পারিনি। অনেক সময় তুই হয়তো ভেবেছিস, আমি তোকে ভালোবাসি না। কিন্তু বাবা, কিছু মানুষ ভালোবাসা বলতে জানে না, শুধু করে যেতে জানে। তুই যখন আমার দিকে অভিমান নিয়ে তাকাস, আমি বুঝি। কিন্তু কীভাবে কাছে যাব, সেই ভাষাটা আমার জানা নাই। তুই যখন ঘুমিয়ে থাকিস, আমি তোর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। আর ভাবি, তোর মা থাকলে তোকে কত সুন্দর করে বড় করত। আমি চেষ্টা করেছি, কিন্তু সবসময় পারিনি। তুই রাগ করিস না। আমি তোকে খুব ভালোবাসি। শুধু বলতে পারি না।”
চিঠিটা পড়তে পড়তে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
সেদিন প্রথম বুঝতে পারলাম, এতদিন যে নীরবতাকে আমি শূন্যতা ভেবেছি, সেটাই ছিল এক ধরনের ভালোবাসা। খুব চুপচাপ, অগোছালো, অসম্পূর্ণ—তবুও খাঁটি।
যে মানুষটা কখনো মুখে “ভালোবাসি” বলেননি, সেই মানুষটাই বছরের পর বছর আমার ছোট ছোট প্রয়োজন খেয়াল করেছেন। দরজার পাশে নতুন জুতা রেখে দিয়েছেন। বৃষ্টির দিনে ছাতা রেখেছেন। পরীক্ষার আগে ব্যাগে অতিরিক্ত কলম দিয়েছেন। রাত জেগে দরজা খুলেছেন। নিজের অসুখ লুকিয়ে আমার খরচ পাঠিয়েছেন।
মায়ের অনুপস্থিতি তিনি কোনোদিন পূরণ করতে পারেননি—হয়তো কেউ পারে না। কিন্তু তিনি তাঁর মতো করে চেষ্টা করেছেন, যেন আমি একেবারে একা হয়ে না যাই।
আজ বুঝি, ভালোবাসা সবসময় ফুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকে না। কখনো ভালোবাসা দাঁড়িয়ে থাকে দরজার আড়ালে। কখনো চুপচাপ খাবার গরম করে। কখনো নিজের কষ্ট লুকিয়ে সন্তানের জন্য টাকা পাঠিয়ে। কখনো পুরোনো টিনের বাক্সে সন্তানের ছোট ছোট অর্জন জমিয়ে রেখে।





