বাগরামের ধূসর নারী

বাগরামের ধূসর নারী

আধুনিক বিশ্বরাজনীতির দিকে তাকালে একটা শব্দ বারবার সামনে আসে—‘War on Terror’ বা ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’। শব্দটা শুনতে যতটা কৌশলী, বাস্তবটা ততটাই কাঁটা ছড়ানো। রক্তের গন্ধ লুকোনোর জন্য শব্দটা যথেষ্ট ছিল কি না, সে প্রশ্ন আমার মাথায় বারবার ঘোরে। ‘গ্লোবাল রিসার্চ: সেন্টার ফর রিসার্চ অন গ্লোবালাইজেশন’ (Global Research: Centre for Research on Globalization)-এর প্রকাশিত একটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্টে মার্কিন ইতিহাসবিদ জেমস এ. লুকাস যে তথ্য তুলে ধরেছেন, তা যে কোনো বিবেকবান মানুষের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ‘‘১৯৪৫ থেকে ২০১৮—এই দীর্ঘ সময় জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আর পরোক্ষ হস্তক্ষেপে, যুদ্ধ, ক্যু, গোপন অভিযান—সব মিলিয়ে নিহত মানুষের সংখ্যা বিশ মিলিয়নের বেশি।’’
বিশ মিলিয়ন—সংখ্যাটা লিখতে সহজ, কিন্তু ভেবে দেখলে…? ভাঙা ঘর, নামহীন কবর, বিধবা নারী, বাবা হারানো শিশুর নিরব চোখ কিংবা এমন সব শিশু—যাদের বড় হয়ে পৃথিবীর জন্য কিছু করার কথা ছিল। কিন্তু তারা? বড় হওয়ার সুযোগই পায়নি, আর এমন কিছু শহর যাদের নাম আজ আর মানচিত্রে নেই!

এই ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপকতা বুঝতে হলে আমাদের তাকাতে হবে চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ফিজিশিয়ানস ফর সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি’ (Physicians for Social Responsibility)-এর আরেকটি রিপোর্টের দিকে। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ‘‘২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের পর তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’র নামে কেবল ইরাক, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানেই প্রায় ১.৩ মিলিয়ন বা ১৩ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।’’ এই লাশের মিছিলে যেমন আছে যোদ্ধারা, তেমনি আছে নিরপরাধ নারী, শিশু এবং বৃদ্ধরা। এই যুদ্ধের ডামাডোলে হারিয়ে গেছে কত শত প্রতিভা, কত উজ্জ্বল নক্ষত্র, কত গল্প, যা শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেছে। এসবের কোনো পরিসংখ্যান নেই।

এই বিশাল, প্রায় অগণন গল্পের ভিড়ে হঠাৎ একটা নাম আলাদা করে চোখে পড়ে—ড. আফিয়া সিদ্দিকী। তিনি কি শুধুই একজন নারী? নাকি এই সময়ের এক করুণ প্রতীক? এমআইটি (MIT) এবং ব্র্যান্ডিজ ইউনিভার্সিটির মতো বিশ্বসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী এই স্নায়ুবিজ্ঞানী (Neuroscientist), যিনি একসময় স্বপ্ন দেখতেন শিশুদের জন্য এক অভিনব শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার। খুব সাধারণ, মানবিক এক স্বপ্ন। অথচ সময়, রাজনীতি আর ক্ষমতার খেলায় তার পরিচয়টাই বদলে গেল। কেউ তাকে বলল ‘লেডি আল-কায়েদা’, কেউবা ডাকল ‘গ্রে লেডি অব বাগরাম’।এখানেই গল্পটা থমকে যায়। ঠিক কোনটা সত্য, কোনটা নির্মিত—সেটা বলা আজ বড় কঠিন। তাঁর জীবনের চারপাশে জমে আছে সন্দেহ, গোপন নথি, হারিয়ে যাওয়া বছর, সন্তানের আহাজারি, আর এক মায়ের আর্তনাদ। তাকে নিয়ে রচিত হয়েছে গোয়েন্দা সংস্থার হাজারো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, কূটনৈতিক টানাপড়েন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক দীর্ঘ ইতিহাস।

জন্ম ও পারিবারিক আভিজাত্য;

১৯৭২ সাল ২রা মার্চ। পাকিস্তানের বন্দরনগরী করাচিতে জন্ম নিলেন আফিয়া সিদ্দিকী। তাঁর জন্ম এমন এক পরিবারে, যেখানে আভিজাত্য আর শিক্ষার মেলবন্ধন ছিল দেখার মতো। বাবা মুহাম্মদ সালেহ সিদ্দিকী ছিলেন ব্রিটিশ ডিগ্রিধারী নামকরা নিউরোসার্জন, আর মা ইসমাত সিদ্দিকী ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী ও ধর্মভীরু নারী। পারিবারিক ঐতিহ্যের শিকড় ছিল অনেক গভীরে। শোনা যায়, মায়ের দিক থেকে তাঁরা ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর বংশধর।

তিন ভাইবোনের মধ্যে আফিয়া ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তার বড় ভাই মুহাম্মদ সিদ্দিকী একজন আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ার এবং বড় বোন ড. ফাওজিয়া সিদ্দিকী হার্ভার্ড প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ (Neurologist)। আফিয়ার শৈশবের একটি বড় অংশ কেটেছে আফ্রিকার দেশ জাম্বিয়াতে। বাবার চাকরির সুবাদে তিনি সেখানে ৮ বছর বয়স পর্যন্ত অবস্থান করেন। এরপর তিনি পাকিস্তানে ফিরে আসেন এবং করাচির সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট স্কুলে তার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। ছোটবেলা থেকেই আফিয়া ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, নম্র এবং লাজুক স্বভাবের। পুতুল খেলার বয়সেও তার মধ্যে এক ধরনের গাম্ভীর্য ছিল। তিনি পবিত্র কুরআন হিফজ করেছিলেন এবং ধর্মতত্ত্বের প্রতি ছিল তার অগাধ আগ্রহ। বাইবেল এবং তোরাহ সম্পর্কে তার জ্ঞান এতই গভীর ছিল যে, তার বোন ফাওজিয়া তাকে মজা করে ডাকতেন ‘তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের এনসাইক্লোপিডিয়া’।

শিক্ষাজীবন ও ধর্মীয় জাগরণ;

১৯৯০ সাল। আঠারো বছরের তারুণ্যদীপ্ত আফিয়া। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বুকে নিয়ে তিনি পাড়ি জমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তার বড় ভাই মুহাম্মদ সিদ্দিকী তখন টেক্সাসের হাউস্টনে থাকতেন। ভাইয়ের কাছে থেকেই তিনি হাউস্টন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা শুরু করেন। সেখানে মাত্র তিন সেমিস্টার শেষ করার পরই তিনি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT)-তে সম্পূর্ণ স্কলারশিপ নিয়ে পড়ার সুযোগ পান।

এমআইটিতে থাকা অবস্থায় আফিয়া মেধা ও মননের এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। ১৯৯২ সালে তিনি ‘পাকিস্তানে ইসলামীকরণ এবং নারীদের জীবনে তার প্রভাব’ (Islamization in Pakistan & its Effect on Women) নিয়ে গবেষণার জন্য ‘ক্যারল এল. উইলসন অ্যাওয়ার্ড’ (Carroll L. Wilson Award) অর্জন করেন এবং ৫ হাজার ডলার পুরস্কার লাভ করেন। বয়স তখনও কুড়িতে। 

এরপরের বছর, ১৯৯৩ সাল। ক্যামব্রিজ এলিমেন্টারি স্কুলে ‘সিটি ডেজ’ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে আরও ১,২০০ ডলার পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি এমআইটি থেকে বায়োলজিতে বিএস (BS) ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি ব্র্যান্ডিজ ইউনিভার্সিটি (Brandeis University) থেকে জ্ঞানীয় স্নায়ুবিজ্ঞান (Cognitive Neuroscience) বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘‘অনুকরণের মাধ্যমে শেখা’’ (Learning by Imitation)। তাঁর ধারণা ছিল, শিশুদের জন্য যদি পর্যবেক্ষণ করে শেখার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া হয়, তাহলে তারা দ্রুত শিখে নেবে। এমনকি যাদের শেখার ক্ষেত্রে সমস্যা হয়, তারাও এই পদ্ধতিতে শিখতে সক্ষম হবে। এ জন্য তিনি ১০ বছরের একটি সিলেবাস তৈরি করে পাকিস্তানের সরকারের কাছে উপস্থাপনও করেছিলেন। অনেকের মতে, তার এই গবেষণা সঠিকভাবে প্রয়োগ হলে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন হতো। পাকিস্তানের প্রত্যেক গ্র্যাজুয়েট হতো কুরআনের হাফিজ।

আমেরিকার চাকচিক্যময় জীবন আফিয়াকে তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। এমআইটিতে থাকাকালীন তিনি মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (MSA)-এর একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সংগঠন নিজেদের প্রচারণা চালাতে যেভাবে টেবিল সাজিয়ে বই বিতরণ করত, আফিয়াও তেমনি কুরআনের অনুবাদসহ কপি সাজিয়ে বসতেন। তাঁর টেবিলে লেখা থাকত— ‘Your Free Encyclopedia of Life’ (আপনার জীবনের মুক্ত বিশ্বকোষ)। তিনি পুরস্কার হিসেবে যে অর্থ পেতেন, তার সবই কুরআনের কপি ক্রয় ও বিতরণের কাজে ব্যয় করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘আমেরিকা আমাকে জাগতিক শিক্ষা দিয়েছে; আর আমি আমেরিকার জনগণকে ইসলামের শিক্ষা দেব।’

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার যুদ্ধের সময় সেখানকার নির্যাতিত মুসলিম নারী ও শিশুদের জন্য তিনি তহবিল সংগ্রহে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই সময় তিনিই ছিলেন প্রথম নারী, যিনি বসনিয়ার অসহায় মানুষদের জন্য ১ হাজার ডলার সংগ্রহ করেছিলেন। এটি কোনো ছাত্রীর পক্ষ থেকে তহবিল গঠনের ক্ষেত্রে সম্ভবত একটি বিশ্বরেকর্ড ছিল। সংগৃহীত এই অর্থ তৎকালীন প্রচলিত একটি চ্যারিটি নেটওয়ার্ক ছিল, যার মাধ্যমে তহবিল পাঠানো হতো। কিন্তু পরবর্তীকালে (৯/১১-এর পর) জানা যায়, এই দাতব্য সংস্থাটি আফগানিস্তানে মুজাহিদদের জন্য (এফবিআইয়ের ভাষ্যমতে) অর্থ ও লোক পাঠানোর কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। ৯/১১-এর পর আমেরিকা এই প্রতিষ্ঠানকে ‘সন্ত্রাসে অর্থায়নকারী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করে বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ততদিনে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে! এফবিআইয়ের নজর আফিয়ার ওপর পড়ে যায়! সে কখন খাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে দেখা করছে, এমনকি কার সঙ্গে কথা বলছে—সবকিছুই এফবিআইয়ের পর্যবেক্ষণে চলে আসে।

বিবাহ ও বিচ্ছেদ;

১৯৯৫ সাল। তখনো আফিয়া এমআইটির ছাত্রী। পড়াশোনার মাঝেই, পরিবারের পছন্দে, ডা. আমজাদ মোহাম্মদ খানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এটি ছিল সম্পূর্ণ পারিবারিকভাবে আয়োজিত একটি বিয়ে। বিয়ের পর তারা বোস্টন এলাকায় বসবাস শুরু করেন। আমজাদ খান ছিলেন একজন অ্যানেসথিসিয়াবিদ। বাইরে থেকে এই দম্পতিকে সুখী মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে তাদের সংসারে মতবিরোধের বীজ রোপিত হচ্ছিল।   

সময় গড়ায়। তাদের সংসারে একে একে তিনটি সন্তান আসে। আহমেদ—১৯৯৬ সালে। মারিয়াম—১৯৯৮। দুজনই জন্মসূত্রে আমেরিকান নাগরিক। এরপর ২০০২ সালে আসে সুলাইমান, সবচেয়ে ছোট। সন্তানদের নিয়ে আফিয়ার পৃথিবী বড় হচ্ছিল, আবার জটিলও হচ্ছিল।

আফিয়া এবং আমজাদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তির মূল কারণ ছিল আদর্শিক মতপার্থক্য এবং পারিবারিক নির্যাতন। আমজাদ খানের অভিযোগ অনুযায়ী, আফিয়া তাকে বসনিয়ায় গিয়ে মুজাহিদদের সাহায্য করার জন্য বা জিহাদে অংশ নেওয়ার জন্য চাপ দিতেন, যা আমজাদ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

অন্যদিকে, আফিয়ার পরিবার আমজাদ খানকে একজন নির্যাতনকারী স্বামী হিসেবে আবিষ্কার করেন। তাদের মতে, আমজাদ খান আফিয়ার ওপর নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। একটি হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা জানা যায়—এক তর্কের সময় আমজাদ খান আফিয়ার দিকে দুধের বোতল ছুড়ে মারেন। সেই বোতলের আঘাতে আফিয়ার ঠোঁট ফেটে যায় এবং তাকে হাসপাতালে নিয়ে সেলাই দিতে হয়। 

এরই মধ্যে আসে ৯/১১। সেই ঘটনার পর আমেরিকায় মুসলিমদের জীবন হঠাৎ বদলে যায়। সন্দেহ, ভয়, চাপ—সবকিছু। আফিয়া মনে করতেন, এই দেশে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়। তার আশঙ্কা হত, একদিন হয়তো জোর করেই তার সন্তানদের খ্রিস্টান বানানো হতে পারে। তাই তিনি পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে শিশুদের জন্য একটি ইসলামি ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে স্কুল খোলার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু আমজাদ খান আমেরিকাতেই থেকে যেতে চেয়েছিলেন। এই মতপার্থক্য তাদের বিচ্ছেদের পথ আরো প্রশস্ত করে দেয়।

২০০২ সালের আগস্ট মাসে তাদের সম্পর্কের চূড়ান্ত ফাটল ধরে। আমজাদ খান আফিয়ার বাবার বাড়িতে গিয়ে তাকে তালাক দেওয়ার ঘোষণা দেন। সেই সময় আফিয়া তার তৃতীয় সন্তান সুলাইমানকে গর্ভে ধারণ করছিলেন। অভিযোগ রয়েছে যে, বিতর্কের সময় আমজাদ খানের ধাক্কায় আফিয়ার অসুস্থ বাবা মাটিতে পড়ে যান এবং হৃদ্রোগে (হার্ট অ্যাটাক) আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। বাবার মৃত্যুশোক আর ভাঙা সংসারের বোঝা নিয়ে ২০০২ সালের অক্টোবরে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।

অন্ধকারে পাঁচ বছর;

২০০৩ সালের ৩০ মার্চ। করাচির গুলশান-ই-ইকবাল এলাকা থেকে একটি ট্যাক্সি বের হয়। তাতে ছিলেন ড. আফিয়া সিদ্দিকী এবং তার তিন সন্তান—আহমেদ (৭ বছর), মারিয়াম (৫ বছর) এবং সুলাইমান (৬ মাস)। আফিয়ার গন্তব্য ছিল রাওয়ালপিন্ডি তার চাচার বাসা এবং সেখান থেকে ইসলামাবাদে—তৎকালীন পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। কিন্তু পথেই ঘটে গেল এক ভয়াবহ ঘটনা। হঠাৎ কয়েকজন সশস্ত্র লোক তাদের বহনকারী ট্যাক্সি আটকে আফিয়াকে তুলে নেয় এক গাড়িতে; আহমাদ ও মারিয়ামকে অন্য গাড়িতে। আর ছোট্ট সুলাইমান? তাকে নিষ্ঠুরভাবে মাটিতে ছুড়ে ফেলে দেয়।

এরপর আফিয়া, আহমাদ ও মারইয়ামকে আলাদা করে আইএসআই এর একটি গোপন আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আহমাদ ও মারইয়ামকে রাখা হয় অন্ধকার, নোংরা, জানালা বিহীন একটি কক্ষে। কিছুদিন পর তাঁদের তুলে দেওয়া হয় আমেরিকান এফবিআই এজেন্টের হাতে। তারা করাচি থেকে তাঁদের নিয়ে যায় আফগানিস্তানের কাবুলে। আফিয়াকে পাঠানো হয় সিআইএর কুখ্যাত বাগরাম ব্ল্যাক সাইট কারাগারে। আর মাত্র সাত বছরের আহমাদকে পাঠানো হয় কিশোর কারাগারে, যেখানে সে পাঁচ বছর বন্দি থাকে। এমনকি তাঁর আসল নাম পর্যন্ত বদলে দেওয়া হয়। ‘আহমাদ’ থেকে তাঁকে ডাকা হতে থাকে ‘আলি’ নামে। 

অন্যদিকে তিন বছরের ছোট্ট মারইয়ামকে দেওয়া হয় এক খ্রিষ্টান দম্পতি যশ ও নাতালির কাছে, যারা মূলত এফবিআইয়ের এজেন্ট ছিল। তারা মারইয়ামের নাম বদলে রাখে ‘ফাতিমা’। মারইয়াম সেই অচেনা পরিবারে সাত বছর বয়স পর্যন্ত তাদের কাছেই থাকে, নিজের আসল পরিচয় ভুলে। এভাবেই শুরু হয় আফিয়া সিদ্দিকী ও তাঁর সন্তানদের দীর্ঘ গুম, নির্যাতন ও অমানবিকতার গল্প—যার শেষ আজও হয়নি।

আফিয়া সিদ্দিকী একা এই নির্মমতা ও অন্যায়ের শিকার ছিলেন না। নাইন-ইলেভেনের পর এসব অপহরণ, গুম আর নির্যাতন যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ হারিয়ে যেত আর পরদিন খবরের কাগজের এক কোণায় ছোট্ট করে ছাপা হতো—‘সন্ত্রাসবাদের সন্দেহে এক নারী আটক’ কিংবা ‘আল-কায়েদার সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে গ্রেপ্তার’। ব্যস, এটুকুই। তারপর? তারপর সেই খবরও কেমন করে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যেত! রহস্যজনকভাবে।
আফিয়ার ক্ষেত্রেও চিত্রনাট্যটা ছিল ঠিক তেমনই। ২০০৩ সালের ৩১ মার্চ রাতের আঁধারে পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনালের সাংবাদিক আজফারুল আশফাক একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘মার্কিন ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)-এর মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা এক নারীকে গতকাল রাতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগর করাচি থেকে আটক করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁর সঙ্গে আল-কায়েদা সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের যোগাযোগ রয়েছে।’ খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল সারা বিশ্বে। কিন্তু অবাক করা কাণ্ড ঘটল ঠিক তার পরদিন। হঠাৎ সব মিডিয়া থেকে খবরটা গায়েব! যেন জাদুমন্ত্রে মুছে ফেলা হলো সব। উদ্দেশ্য পরিষ্কার—আফিয়াকে যে আদৌ অপহরণ করা হয়েছিল, তার যেন কোনো প্রমাণই অবশিষ্ট না থাকে।

বিভিন্ন তথ্য মতে, এই অপহরণের পেছনে লুকিয়ে ছিল এক বিকৃত রাজনৈতিক বাণিজ্য। আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ, তাদের তথাকথিত ‘বাউন্টি প্রোগ্রাম’-এর আওতায় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে প্রস্তাব দেয়—‘আফিয়াকে আমাদের হাতে তুলে দিলে ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার দেওয়া হবে’। 

২০০৬ সালে প্রকাশিত পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ তার আত্মজীবনী ‘In the Line of Fire’-এ তিনি এক বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি দেন। তিনি লেখেন: ‘‘আমরা ৬৮৯ জন আল-কায়েদা ও তালেবান সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছি এবং ৩৬৯ জনকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছি। আমরা এর বিনিময়ে কয়েক মিলিয়ন ডলার পুরস্কার (bounty) অর্জন করেছি।’’

যদিও মোশাররফ বইটিতে সরাসরি আফিয়ার নাম উল্লেখ করেননি, তবে মানবাধিকার কর্মী, আফিয়ার আইনজীবী এবং বিভিন্ন রিপোর্ট নিশ্চিত করে যে, আফিয়া সিদ্দিকী ছিলেন সেই ‘বিক্রি করা’ নাগরিকদের একজন। আফিয়ার আইনজীবী ক্লাইভ স্ট্যাফোর্ড স্মিথ সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা মোশাররফের শাসনামলে আফিয়াকে পুরস্কারের লোভে আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছিল।

২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছর আফিয়া সিদ্দিকীর কোনো হদিস ছিল না। এফবিআই এবং পাকিস্তান সরকার বারবার তার আটকের বিষয়টি অস্বীকার করতে থাকে। কিন্তু এই সময়ে আফগানিস্তানের বাগরাম বিমান ঘাঁটির কুখ্যাত মার্কিন কারাগারে ‘প্রিজনার ৬৫০’ (Prisoner 650) নামে এক নারী বন্দির অস্তিত্বের কথা জানা যায়।

ব্রিটিশ সাংবাদিক ইভন রিডলি (Yvonne Ridley) এবং বাগরামের সাবেক বন্দি মোয়াজ্জেম বেগ (Moazzam Begg) বিশ্ববাসীকে জানান যে, বাগরাম কারাগারে এক নারীকে রাখা হয়েছিল, যার আর্তচিৎকার এবং কান্না অন্য বন্দিদের রাতের ঘুম হারাম করে দিত। তাকে ‘গ্রে লেডি অব বাগরাম’ (Grey Lady of Bagram) বা বাগরামের ধূসর মানবী বলা হতো। মোয়াজ্জেম বেগ তার এনিমি কমব্যাট্যান্ট (Enemy Combatant) নামে একটি বইয়ে বাগরামের স্মৃতিকথা বলতে গিয়ে বলেন; 

‘‘বাগরামের সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পাশের সেল থেকে ভেসে আসা এক নারীর হাড়হিম করা আর্তচিৎকার আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল। কে তিনি? কী তাঁর পরিচয়? এই প্রশ্নগুলো মস্তিষ্কে হাতুড়ির মতো ঘা দিচ্ছিল, এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। নিজের সাথে নিজের সে এক ভয়ংকর যুদ্ধ। উত্তরটা জানতে প্রচণ্ড ভয় হচ্ছিল আমার—শিরা-উপশিরায় হিমশীতল স্রোত বয়ে যেত একটা কথা ভেবেই—সেই নারী যদি আমার স্ত্রী হয়?

টানা দু’দিন এবং দু’রাত। বিরামহীন সেই চিৎকার। আমার মাথা আর কাজ করছিল না, চিন্তাশক্তি যেন ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মাথায় খুন চড়ে যেত। একবার ভাবলাম, গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাতের শেকল ছিঁড়ে ফেলি, ঝাঁপিয়ে পড়ি গার্ডের ওপর। তার অস্ত্রটা কেড়ে নিয়ে পাশের সেলে ছুটে যাই, তারপর চিরতরে থামিয়ে দিই এই পৈশাচিকতা। কিন্তু পরক্ষণেই এক অদ্ভুত অবসাদ আমাকে গ্রাস করত। বাস্তবতার কঠিন শেকল আমাকে মনে করিয়ে দিত আমার অক্ষমতা। মনে হতো, আমি তো মৃত; ওরা যা খুশি তাই করুক।
শেষমেশ সহ্য করতে না পেরে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমরা পাশের সেলে একজন নারীকে কেন রেখেছ?’ তারা আমাকে বলল, ‘পাশের সেলে কোনো নারী নেই।’ ওদের এই সাজানো উত্তরে আমি আশ্বস্ত হতে পারলাম না। কারণ, রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ভেসে আসা সেই আর্তনাদ আমাকে তাড়া করে ফিরত দুঃস্বপ্নের মতো। সেই কান্নার শব্দে যে আকুতি ছিল, তা কোনো ভ্রম হতে পারে না।

পরে যখন আমাকে কুখ্যাত গুয়ান্তানামো বে কারাগারে পাঠানো হলো, সেখানে গিয়ে ভুল ভাঙল। অন্যান্য বন্দিদের সাথে কথা বলে জানলাম, শুধু আমি নই—অনেকেই সেই হাড়হিম করা চিৎকার শুনেছে, যা সবার কাছে বন্দি নম্বর ৬৫০ নামে পরিচিত। সেই নির্জন প্রকোষ্ঠে তাঁর ওপর যা চলত, তা ছিল মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানানো। শারীরিক, মানসিক আর যৌন নির্যাতনের এক পৈশাচিক উৎসব চলত সেখানে। তল্লাশির নামে তাঁকে জোরপূর্বক উলঙ্গ করা হতো, আর সেই দৃশ্য ভিডিও করে রাখা হতো। তারপর হুমকি দেওয়া হতো—‘কথা না শুনলে এই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেব।’ একজন নারীর সম্ভ্রম নিয়ে এমন নোংরা খেলা কল্পনা করাও কঠিন। অন্য বন্দীরা তাঁর মুক্তির জন্য প্রতিনিয়ত দুআ করত। ’’

মুয়াজ্জাম বেগের লেখা সেই বইটা একসময় গিয়ে পৌঁছাল ইভন রিডলির (Yvonne Ridley) হাতে। ভদ্রমহিলা ছিলেন একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক, যিনি দ্য সানডে টাইমস, দ্য অবজার্ভার এবং দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের হয়ে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ সংবাদ কভার করেছেন। যুদ্ধের খবর সংগ্রহ করতে ছুটে বেড়িয়েছেন সাইপ্রাস, দামেস্ক, লকার্বি… কিংবা বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে থাকা আফগানিস্তান থেকে উত্তর আয়ারল্যান্ড পর্যন্ত। 

আফিয়ার বিষয়ে মুআজ্জাম বেগের বই পড়ে বাগরাম কারাগারে এক নারীর চিৎকারের বর্ণনা জানার পর রিডলি এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে অনুসন্ধান শুরু করেন। বাগরাম থেকে পালিয়ে আসা একজন বন্দির সাক্ষাৎকার পান রিডলি। সেই ব্যক্তি ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দের জুলাইয়ে বাগরাম থেকে কৌশলে পালিয়ে ছিলেন। তার বর্ণনায় উঠে আসে—‘বাগরামে একজন নারীকে দুই বছর নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছিল। ৫০০ পুরুষ বন্দির মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র নারী। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার আগ পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন। সারা দিন দরজায় আঘাত করতেন আর চিৎকার করতেন।’

২০০৮ সালের জুলাই মাসের শুরুতে ইভন রিডলি পাকিস্তান সফরে যান। ৬ জুলাই ইসলামাবাদে একটি বড় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ (পিটিআই) চেয়ারম্যান ইমরান খানও এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। শতাধিক স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিক এই সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। রিডলি সাংবাদিকদের মাধ্যমে আহ্বান জানান—‘আমেরিকাকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করুন, বন্দি নম্বর ৬৫০ কে? কতটি গোপন কারাগার আছে?’

এই যুগান্তকারী সংবাদ সম্মেলন তৎকালীন সময় গোটা মুসলিম দেশগুলোতে বিশেষ করে পাকিস্তানের মিডিয়ায় ঝড় তুলে। সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে আফিয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। ইমরান খান সরাসরি পাকিস্তান সংসদে এই ইস্যু উত্থাপন করেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা আমেরিকার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানায়। সব মিলিয়ে যখন আফিয়ার বিষয়ে চাপ চরমে উঠেছিল, ঠিক তখনই ২০০৮ সালের জুলাই মাসে, পাঁচ বছর নিখোঁজ থাকার পর, আফিয়া সিদ্দিকীকে আফগানিস্তানের গজনি প্রদেশে নাটকীয়ভাবে ‘আবিষ্কার’ করা হয়। আর এই ঘটনাটি যেমন ছিল রহস্যময়, তেমনি অবিশ্বাস্য।

সাজানো নাটক;

১৭ জুলাই, ২০০৮। দিনটা আফিয়া সিদ্দিকীর জীবনে এসেছিল এক চিলতে ভোরের আলোর মতো। বাগরাম কারাগারের সেই অন্ধকার সেলে হঠাৎ করেই যেন আশার প্রদীপ জ্বলে উঠল। তাঁকে জানানো হলো, আজই তিনি মুক্তি পাবেন। তবে শর্ত আছে। আমেরিকানরা তাঁকে আফগানিস্তানের গজনি শহরের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যাবে। সেখানে যা বলা হবে, ঠিক সেটাই করতে হবে। বিনিময়ে শুধু মুক্তি নয়—তাঁর হারিয়ে যাওয়া মেয়ে মারইয়ামকেও ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এরপর চাইলে সন্তানদের নিয়ে পাকিস্তানে চলে যেতে পারবেন।

এত বছর পর মেয়ের নামটা শুনে আফিয়ার বুক কেঁপে ওঠে। যুক্তি, সন্দেহ—সবকিছু ছাপিয়ে একটাই অনুভূতি কাজ করে: সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুলতা। তিনি শর্ত মেনে নেন।

কাবুল থেকে গজনি গামী একটি বাসে সিআইএ তাঁকে তুলে দেয়। পাশের সিটে বসানো হয় ১৩–১৪ বছরের এক ছেলেকে। ছেলেটির চোখে ভয়, শরীরে জড়তা। আফিয়া বারবার তাকান—অদ্ভুত রকম চেনা লাগে, তবু চিনতে পারেন না। তিনি জানতেন না, এই ছেলেটিই তাঁর বড় ছেলে আহমাদ। বছরের পর বছর বন্দিত্ব আর অন্ধকার তাঁকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে নিজের সন্তানকেও চিনে নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আহমাদের অবস্থাও ছিল ভয়াবহ। দীর্ঘদিন আফগান কারাগারে তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। নিজের নাম পর্যন্ত ভুলিয়ে দেওয়া হয়। বারবার শেখানো হয়েছে—“তোর নাম আলি।” নাম ভুল বললেই শাস্তি। ধীরে ধীরে সেই নামটাই তার মনে গেঁথে যায়।
বাসে বসে মা যখন স্নেহভরে জিজ্ঞেস করেন, “বাবা, তোমার নাম কী?”—ছেলেটির মুখ থেকে যন্ত্রের মতো বেরিয়ে আসে, “আমার নাম আলি।”
এই ছিল মা ও ছেলের পুনর্মিলন—নিঃশব্দ, ভাঙাচোরা, মর্মান্তিক।

গজনিগামী বাসে তুলে দেওয়ার আগে আরও একটি নাটক সাজানো হয়। জুলাইয়ের প্রচণ্ড গরমে আহমাদকে পরানো হয় এক অদ্ভুত জ্যাকেট, যার চারপাশে অসংখ্য পকেট। পকেট গুলোতে ছিল ফল—আপেল, কমলা। কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল অন্য। দূর থেকে দেখে যেন মনে হয়, জ্যাকেটের ভেতর বোমা জাতীয় কিছু কিছু লুকানো আছে। সন্দেহ তৈরি করাই ছিল লক্ষ্য।
এদিকে তাদের সিটের নিচে আগে থেকেই গোপনে কেউ বিস্ফোরক রেখে দেয়। পরিকল্পনাটা ছিল ভয়াবহ—আফিয়া যখন মেয়ের জন্য অপেক্ষা করবেন, তখন আফগান পুলিশকে খবর দেওয়া হবে যে ‘সন্ত্রাসীরা বিস্ফোরক নিয়ে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।’ গুলি চালাবে আফগান পুলিশ, দোষ পড়বে তাদেরই ওপর। সিআইয়ের হাত থাকবে পরিষ্কার।

অতঃপর, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ মসজিদের সামনে ঠিক সেটাই হতে যাচ্ছিল। পুলিশ ঘিরে ফেলল তাঁদের। তবে গুলি চালানোর আগমুহূর্তে স্থানীয় এক ব্যক্তি—আজমাল মুহাম্মাদী—প্রতিবাদ করেন। বলেন, ‘‘এরা নিরীহ মানুষ, হয়তো আপনাদের ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে।’’
পরে আফগান পুলিশ আফিয়া ও আহমাদকে ধরে নিয়ে যায় আফগান ন্যাশনাল হেডকোয়ার্টারে। সেখান থেকে হস্তান্তর করা হয় কাউন্টার টেরোরিজম ডিপার্টমেন্টের কাছে। 

পরদিন সকালটা ছিল ১৮ জুলাই। কারাগারের বিশাল এক হলরুমে তড়িঘড়ি করে ডাকা হলো প্রেস কনফারেন্স। ভারি গলায় ঘোষণা এল—‘‘আমরা আল-কায়েদার নারী সদস্য ড. আফিয়া সিদ্দিকীকে গ্রেফতার করেছি। তিনি গজনি গভর্নরের কম্পাউন্ডের কাছে সন্দেহজনক ঘোরাফেরা করছিল, তাঁর ব্যাগে রাসায়নিক পদার্থ, নিউইয়র্কের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মানচিত্র এবং ব্যাপক হামলার পরিকল্পনা সংক্রান্ত হাতে লেখা নোট পাওয়া গেছে।’’ খবর শোনার সাথে সাথে চারিদিকে সাংবাদিকদের ব্রেকিং নিউজের হিড়িক পড়ে যায়। 

বিকেলে তাঁকে একটি রুমে নেওয়া হয়। মাঝখানে ঝুলানো হলুদ পর্দায় রুমটি দু’ভাগ করা। সেখানে কোনো সিসিটিভি ছিল না। তাঁর হাত-পা তখনও শক্ত করে বাঁধা। বাঁধনের চাপে হাত ফুলে নীল হয়ে গিয়েছিল। তিনি আফগান রক্ষীদের বারবার অনুরোধ করছিলেন—বাঁধন না খুললে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে তিনি হাত হারিয়ে ফেলতে পারেন! কিন্তু কেউ তাঁর কথায় কান দিল না।

রাত ১টার দিকে আমেরিকান এফবিআই এজেন্ট ও সেনা কর্মকর্তারা রুমে প্রবেশ করেন। তাদের অফিশিয়াল ভাষ্যমতে, ‘চিফ ওয়ারেন্ট অফিসার সৌজন্যবশত তাঁর এম-৪ (M4) রাইফেলটি পায়ের কাছে নামিয়ে রাখেন। হঠাৎ আফিয়া সেই ভারী রাইফেল তুলে ‘আমেরিকানদের মৃত্যু হোক’ বলে চিৎকার করে গুলি চালান। আত্মরক্ষার্থে অফিসার নিজের M9 পিস্তল দিয়ে আফিয়াকে পাল্টা গুলি করে। এতে তিনি পেটে গুলিবিদ্ধ হন।’

রক্তাক্ত আফিয়াকে দ্রুত গজনির একটি সামরিক মেডিকেল ইউনিটে নেওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর বোঝা যায়—অস্ত্রোপচার দরকার। ‘ব্ল্যাক হক’ হেলিকপ্টারে তাঁকে ওরগুন-ই-তে পাঠানো হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারে তাঁর একটি কিডনি ও অন্ত্রের অংশ কেটে ফেলতে হয়। এরপর তাঁকে বাগরাম বিমানঘাঁটিতে কঠোর পাহারায় রাখা হয়।

প্রেস কনফারেন্স ও গুলির ঘটনার পর মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হলে সত্য যাচাইয়ের চাপ বাড়ে। ফলে তদন্তে নামানো হয় এফবিআই এজেন্ট হারলি ও মাইকেল মুরহেডকে। ১৯ জুলাই তাঁরা হাসপাতালে আফিয়ার আঙুলের ছাপ, রক্ত ও চুলের নমুনা নেন, চিকিৎসকের বক্তব্য নেন। এরপর একে একে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় ঘটনাস্থলে থাকা এফবিআই, সামরিক কর্মকর্তা ও দোভাষীদের। উপস্থিত সাক্ষী, দোভাষী ও অফিসাররা তোতাপাখির মতো হুবহু একই গল্প শোনায়, যা শুনে মনে হয় পুরো ঘটনাটি আগে থেকেই সাজানো বা রিহার্সাল করা।

কিন্তু মাঠপর্যায়ের তদন্তে ছবি বদলাতে থাকে। আফিয়া যে এম-৪ রাইফেলটি তুলে নিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়, অত্যাধুনিক সব পরীক্ষায় (লেজার, কেমিক্যাল টেস্ট) রাইফেলটিতে আফিয়ার কোনো আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থল তন্ন তন্ন করে খুঁজে শুধু অফিসারের পিস্তলের (M9) গুলির খোসা পাওয়া গেছে। কিন্তু এম-৪ রাইফেলের কোনো গুলি, গুলির খোসা বা গানপাউডারের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। যে হলুদ পর্দার আড়াল থেকে গুলি চালানোর কথা, ফরেনসিক ল্যাবের পরীক্ষায় দেখা যায় সেটি সম্পূর্ণ অক্ষত। তাতে কোনো গুলির ছিদ্র বা বারুদের চিহ্ন ছিল না। এমনকি সেখানকার দেয়ালে পাওয়া ছিদ্রগুলোকে এম-৪ রাইফেলের গুলির ছিদ্র বলে দাবি করা হচ্ছিল, তা সেদিন সকালের প্রেস কনফারেন্সের ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ছিদ্রগুলো দেওয়ালে আগে থেকেই ছিল।

অনেকের মতে, আফিয়াকে আগেই গুলি করা হয়েছিল বা তাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই এই নাটক সাজানো হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান।

৮৬ বছরের কারাদণ্ড;

গুলিবিদ্ধ আফিয়াকে চিকিৎসার পর আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১০ সালে নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে তার বিচার শুরু হয়। সেদিন ড. আফিয়া সিদ্দিকীকে আদালতে হাজির করা হয় পায়ে শিকল, হাতে হাতকড়া পরানো অবস্থায়। তাঁর শরীর সদ্য নির্যাতনের দগদগে তাজা জখমে ভরা ছিল। তিনি যখন হাত তুললেন, হাতকড়ার ফাঁক দিয়ে রক্ত ঝরে পড়ছিল। আদালত কক্ষে সেই দৃশ্য কারো চোখ এড়ায়নি।

আদালতে আনার আগ মুহূর্তের ঘটনা ছিল আরও ভয়াবহ। অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। পোশাক ফেরত পাওয়ার শর্ত হিসেবে তাঁকে বলা হয় পবিত্র কুরআনের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে।  আফিয়া তা প্রত্যাখ্যান করলে, পরিণামে তাঁর ওপর নেমে আসে লাথি, ঘুষি, বন্দুকের বাট আর অবর্ণনীয় শারীরিক নির্যাতন।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো—মার্কিন মিডিয়া তাঁকে ‘লেডি আল-কায়েদা’ বলে প্রচার করলেও, আদালতে তাঁর বিচার কোনো সন্ত্রাসবাদ বা আল-কায়েদার সদস্য হিসেবে হয়নি। বরং মামলাটি দাঁড় করানো হয় গজনিতে মার্কিন কর্মকর্তাদের হত্যাচেষ্টার অভিযোগে।

বিচারক রিচার্ড বারম্যান সেদিন পাঁচটি অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেন—মার্কিন নাগরিক হত্যা চেষ্টা, মার্কিন কর্মকর্তা-কর্মচারী হত্যাচেষ্টা, মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলা, দোভাষীর ওপর হামলা এবং এফবিআই এজেন্ট ও সেনা কর্মকর্তার ওপর হামলা। এই অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে আদালত তাঁকে মোট ৮৬ বছরের কারাদণ্ড দেন। 

বর্তমান অবস্থা; 

বর্তমানে ৫৩ বছর বয়সী ড. আফিয়া সিদ্দিকী টেক্সাসের ফোর্ট ওর্থ-এ অবস্থিত এফএমসি কার্সওয়েল (FMC Carswell) নামক ফেডারেল মেডিকেল সেন্টারে বন্দি আছেন। তার কয়েদি নম্বর ৯০২৭৯-০৫৪। এই কারাগারটিকে অনেকে ‘হাসপাতাল অফ হররস’ (Hospital of Horrors) বা আতঙ্কের হাসপাতাল বলে অভিহিত করেন।

২০২৪ এবং ২০২৫ সালের বিভিন্ন রিপোর্টে উঠে এসেছে যে, এই কারাগারে আফিয়া সিদ্দিকী চরম অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। তার আইনজীবী ক্লাইভ স্ট্যাফোর্ড স্মিথ এবং তার বোন ড. ফাওজিয়া সিদ্দিকী অভিযোগ করেছেন যে, আফিয়াকে সেখানে নিয়মিত যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ এবং শারীরিক প্রহারের শিকার হতে হচ্ছে। কারাগারের রক্ষীরা এবং এমনকি অন্যান্য বন্দিরাও তাকে নির্যাতন করে। প্রতিদিন জোর করে তাকে উলঙ্গ করা হয় স্ট্রিপ সার্চ এর নামে, যেখানে পুরুষ প্রহরীরা ইচ্ছাকৃতভাবে অপমানজনক মন্তব্য করে। কুরআন তেলাওয়াত কিংবা নামাজ পড়তেও বাধা দেওয়া হয়। 

দীর্ঘ ২০ বছর পর, ২০২৩ সালে আফিয়ার বোন ড. ফাওজিয়া সিদ্দিকী তার সাথে সাক্ষাৎ করার অনুমতি পান। ফাওজিয়া সিদ্দিকী জানান, আফিয়া এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন যে তিনি ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না। তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন। তার সামনের দাঁতগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং তিনি কানেও কম শুনছেন। 

সন্তানরা এখন কোথায়?

আফিয়ার তিন সন্তানের ভাগ্য তিন রকম হয়েছে, যা এই ট্র্যাজেডিকে আরও বেদনাদায়ক করে তোলে:

  • আহমেদ: ২০০৮ সালে আফিয়া যখন গজনীতে গ্রেপ্তার হন, তখন তার বড় ছেলে আহমেদ (তখন ১১ বছর বয়সী) তার সাথে ছিল। তাকে পরে আফগান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে উদ্ধার করে পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আহমেদ বর্তমানে তার খালা ড. ফাওজিয়া সিদ্দিকীর তত্ত্বাবধানে করাচিতে বসবাস করছে। সে এখন একজন ডাক্তার হিসেবে কর্মরত এবং তার মায়ের মুক্তির অপেক্ষায় দিন গুনছে।
  • মারিয়াম: ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে মারিয়ামকে রহস্যজনকভাবে করাচিতে তার পারিবারিক বাড়ির কাছে ফেলে যাওয়া হয়। তার গলায় ঝুলছিল ছোট্ট একটি চিরকুট। তাতে লেখা ছিল—‘আমি আফিয়া সিদ্দিকীর মেয়ে মারইয়াম।’ পরবর্তীতে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে তার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। সেও এখন তার খালার সাথে থাকে।
  • সুলাইমান: কনিষ্ঠ সন্তান সুলাইমান, যার বয়স অপহরণের সময় ছিল মাত্র ৬ মাস, তার ভাগ্য আজও অজানা। 
কেন তাঁকে মুক্তি দিতে চায় না আমেরিকা?

ড. আফিয়া সিদ্দিকীর মুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে যত বেশি মানবিক হাহাকার উঠছে, আমেরিকার অবস্থান যেন ততই কঠোর হচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (২০২৩–২০২৫) জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটি বারবার আফিয়ার কারাবাসের পরিস্থিতি তদন্তের দাবি জানালেও যুক্তরাষ্ট্র তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। কার্সওয়েল কারাগার থেকে ফাঁস হওয়া ভিডিওতে আফিয়াকে এক অন্ধকার ও সংকীর্ণ সেলে মানবেতর অবস্থায় দেখা যাওয়ার পর বিশ্ববিবেক নাড়া খেলেও, আমেরিকার মন গলে নি।

কিন্তু কেন? একজন নারীকে আটকে রাখার পেছনে আমেরিকার এই জেদ কিসের? বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কাজ করছে বহুমুখী ‘ভয়’ এবং জটিল ভূ-রাজনীতি।

১. মার্কিন সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে আফিয়া সিদ্দিকী সাধারণ কোনো বন্দি নন; তিনি ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি থ্রেড’ বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক জীবন্ত হুমকি। তাদের দাবি, আফিয়া আল-কায়েদার উচ্চপদস্থ নেতাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং একজন স্নায়ুবিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর কাছে রাসায়নিক ও জৈবিক মারণাস্ত্র তৈরির ফর্মুলা রয়েছে। আমেরিকার আশঙ্কা, মুক্তি পেলে তিনি আবারও আমেরিকার বিরুদ্ধে বড় কোনো হামলা চালাতে পারেন।

২. মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকার সবচেয়ে বড় ভয় হলো তাদের নিজেদের মুখোশ খুলে যাওয়া। আফিয়া সিদ্দিকী সিআইএ-এর গোপন কারাগার বা ‘ব্ল্যাক সাইট’ (Black Sites)-এর লোমহর্ষক নির্যাতনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। কার্সওয়েল কারাগারের বর্তমান পরিস্থিতি কিংবা বাগরামের সেই অন্ধকার দিনগুলো নিয়ে যদি তিনি স্বাধীনভাবে মুখ খোলেন, তবে ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নামে চলা আমেরিকার বহু অবৈধ কর্মকাণ্ড ও অমানবিক নির্যাতনের কৌশল ফাঁস হয়ে যাবে। এটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তির জন্য এমন এক বিপর্যয় ডেকে আনবে, যা তারা কোনোভাবেই সামলাতে পারবে না।

৩. আফিয়ার মামলাটি এখন আর নিছক আইনি বিষয় নয়; এটি আমেরিকা ও পাকিস্তানের সম্পর্কের এক ‘লিভারেজ’ বা চাপের হাতিয়ার। আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর পাকিস্তানের ওপর কূটনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে আমেরিকা আফিয়া ইস্যুটিকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে। এর প্রমাণ মেলে ২০১১ সালে, যখন সিআইএ কন্ট্রাক্টর রেমন্ড ডেভিস পাকিস্তানে গ্রেপ্তার হন। তখন আফিয়ার বিনিময়ে রেমন্ডকে ছাড়ার প্রস্তাব উঠলেও আমেরিকা তা নাকচ করে দেয়। অর্থাৎ, নিজ দেশের নাগরিকের জীবনের চেয়েও আফিয়াকে বন্দি রাখাটা তাদের কাছে বেশি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

৪. আমেরিকা মনে করে, আফিয়া সিদ্দিকী বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জিহাদি সংগঠনগুলোর কাছে এক শক্তিশালী ‘প্রতীক’—এ পরিণত হয়েছে। তালেবান থেকে শুরু করে আইসিস (ISIS)—অনেকেই জিম্মি বিনিময়ের শর্ত হিসেবে আফিয়ার মুক্তি দাবি করেছে। ২০২২ সালে টেক্সাসের সিনাগগে জিম্মি সংকটের সময়ও হামলাকারীর প্রধান দাবি ছিল আফিয়ার মুক্তি। আমেরিকার যুক্তি হলো—তাঁকে মুক্তি দেওয়া মানে সন্ত্রাসীদের নৈতিক বিজয় মেনে নেওয়া, যা ভবিষ্যতে আমেরিকান নাগরিকদের অপহরণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেবে।

৫. ৯/১১ পরবর্তী সময়ে আফিয়া সিদ্দিকীর মামলাটি আমেরিকার সন্ত্রাসবিরোধী বয়ানের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁকে মুক্তি দিলে মার্কিন রাজনীতিতে সেটি ‘সন্ত্রাসের প্রতি নরম মনোভাব’ (Soft on Terror) হিসেবে গণ্য হবে, যা কোনো মার্কিন সরকারই মেনে নিতে চায় না। একে তারা আদর্শগত পরাজয় হিসেবে দেখে।

উপসংহার;

সব মিলিয়ে, ড. আফিয়া সিদ্দিকীর বন্দিজীবন আজ আর নিছক কোনো ব্যক্তির হাহাকার বা একজন মায়ের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হয়ে নেই; এটি রূপ নিয়েছে এক জটিল ও নিষ্ঠুর ভূ-রাজনৈতিক দাবার চালে। যেখানে আমেরিকার কাছে ন্যায়বিচার বা মানবাধিকারের চেয়ে ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ আর রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে, মুসলিম উম্মাহর কাছে আফিয়া সিদ্দিকী আজ এক জীবন্ত পরীক্ষা। তাঁর সংসার, নিষ্পাপ সন্তান, উজ্জ্বল ক্যারিয়ার—সবকিছুই আজ রাজনীতির যূপকাষ্ঠে নির্মমভাবে বলি হয়েছে। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তিনি কেবল একা বন্দি নন; তাঁর সঙ্গে বন্দি হয়ে আছে পুরো মুসলিম বিশ্বের তথাকথিত মেরুদণ্ড, নৈতিক সাহস এবং মানবতা। যাদের নীরবতা ও ঘুমন্ত বিবেক ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে ব্যর্থ।

    আমার সম্পর্কে

    আমি ছফওয়ান আল মুসাইব, একজন 3D আর্টিস্ট, ভিডিও এডিটর। 3D আর্টের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই আমি আমার ক্যারিয়ার শুরু করি, এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের দক্ষতা গড়ে তুলেছি। পেশাগত জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি আমি গল্প লেখা এবং ভ্রমণে দারুণ আগ্রহী। শখের বসে মাঝে মাঝে হাতে কলম তুলে নিই এবং আমার মনের ভাবনা ও অনুভূতিগুলোকে শব্দে রূপ দিই। আমার লেখা গল্পগুলো বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে, যা অনেক পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

    জনপ্রিয় পোস্ট

    সাম্প্রতিক পোস্ট

    বাগরামের ধূসর নারী

    বাগরামের ধূসর নারী

    প্রহেলিকা

    প্রহেলিকা

    ড. আফিয়া সিদ্দিকী

    ড. আফিয়া সিদ্দিকী

    আসমান

    আসমান