ড. আফিয়া সিদ্দিকী

ড. আফিয়া সিদ্দিকী

ড. আফিয়া সিদ্দিকী। গত দুই দশক ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মিডিয়া আর ওয়ার অন টেরর-এর আলোচনায় এই নামটা বারবার উঠে এসেছে। কেউ তাঁকে ডাকেন লেডি আল-কায়েদা, আবার কারও কাছে তিনি ডটার অফ দ্য উম্মাহ বা নির্যাতিতা বোন। কিন্তু মিডিয়ার এসব লেভেলিংয়ের বাইরে আসল মানুষটা কে? তাঁর সাথে ঠিক কী হয়েছিল?

সম্প্রতি সাইয়েদ আবদুল্লাহ আল আমিনের লেখা ড. আফিয়া সিদ্দিকি: অপ্রকাশিত সত্য বইটি পড়ার সুযোগ হলো। বইটি শেষ করার পর বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলাম। বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ভারি অনুভূতি কাজ করছিল। বারবার শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছিল—পৃথিবীর কারাগারের দেয়ালগুলো তো ইট-পাথরের, কিন্তু আমাদের বিবেকের দেয়াল কি তার চেয়েও শক্ত?

বইয়ের ভেতরে যা আছে;

বইটা শুরু হয় আফগানিস্তানের ইতিহাস দিয়ে—কিভাবে ভূখণ্ডটি পরাশক্তিদের কবরস্থান হয়ে উঠল, সোভিয়েত আগ্রাসন থেকে শুরু করে নাইন-ইলেভেন পরবর্তী মার্কিন আগ্রাসন পর্যন্ত। প্রথমদিকে আমার মনে হচ্ছিল, আমি কি আফিয়ার জীবনী পড়ছি নাকি আফগানিস্তানের ইতিহাস? কিন্তু একটু পরেই বুঝলাম, আফিয়ার ট্র্যাজেডি বুঝতে হলে এই জিওপলিটিক্যাল প্রেক্ষাপট বোঝাটা জরুরি।

বইটিতে আফিয়ার ব্যক্তিগত জীবন, তাঁর এমআইটি (MIT)-তে পড়ার সময়কার মেধা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, আধুনিক বিজ্ঞান ও ইসলামি জ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটিয়ে পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থাকে সাজানোর স্বপ্ন এবং    ৯/১১ পরবর্তী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে বৈশ্বিক ষড়যন্ত্রে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে পরবর্তীতে সিআইএ-এর ব্ল্যাক সাইট কারাগারের ধূসর নারী হয়ে ওঠার ঘটনাগুলো বিস্তারিত উঠে এসেছে। বিশেষ করে ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তাঁর জীবনের যে সময়টা ‘অন্ধকার’ বা ‘মিসিং লিংক’ হিসেবে পরিচিত, বইটিতে সেই সময়ের রোমহর্ষক বর্ণনা তথ্যনির্ভরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কুখ্যাত বাগরাম কারাগারের সেই ‘কয়েদি নম্বর ৬৫০’ বা ‘গ্রে লেডি অফ বাগরাম’ কি সত্যিই আফিয়া ছিলেন? বইটিতে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত আর রেফারেন্স দিয়ে সেই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।

যা ভালো লেগেছে;

সচরাচর এই ধরনের ক্যাটাগরির বইগুলোতে তথ্যের ঘাটতি থাকে, কিন্তু এই বইতে লেখক প্রচুর ফুটনোট ও রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন। আবেগের বশে ঢালাও মন্তব্য না করে বিভিন্ন বই, আন্তর্জাতিক পত্রিকার রিপোর্ট এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান তুলে ধরেছেন।

সীমাবদ্ধতা; 

বইটি পড়ার সময় আমার মনে হয়েছে, শুরুর দিকে আফগানিস্তানের ইতিহাসের অংশটা সাধারণ পাঠকের জন্য একটু বেশিই দীর্ঘায়িত—যা বইয়ের মোট ১০৪ পৃষ্ঠার ৫৫ পৃষ্ঠা পর্যন্ত। সুতরাং যারা আফিয়ার ঘটনা জানতে চান, তাদের প্রথমে কিছুটা ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে এবং যারা শুধুমাত্র বইয়ের নামের দিকে দৃষ্টি করে, সরাসরি আফিয়ার ঘটনা জানতে চান—তাদের জন্য কিছুটা হতাশাও হতে পারে। 

বইটি কাদের পড়া উচিত?
  • যাঁরা আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিশেষ করে নাইন-ইলেভেন পরবর্তী বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে আগ্রহী।
  • যাঁরা জানতে চান, কেন একজন উচ্চশিক্ষিত নিউরোসায়েন্টিস্টকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে এত তোলপাড়।
  • যাঁরা মানবাধিকার এবং ওয়ার অন টেরর-এর পেছনের কালো অধ্যায়গুলো সম্পর্কে জানতে চান।
শেষ কথা;

আমরা মিডিয়াতে যা দেখি বা শুনি, তার বাইরেও যে সত্যের আরেকটা পিঠ থাকে—বইটি জলজ্যান্ত উদাহরণ! পড়া শেষে আপনার গলার কাছে এক দলা অভিমান আর অসহায়ত্ব দলা পাকিয়ে উঠবে। একজন এমআইটি গ্র্যাজুয়েট, একজন নিউরোসায়েন্টিস্ট, একজন কুরআনের হাফিজা এবং দিনশেষে একজন মা—যিনি পৃথিবীকে হয়তো অনেক কিছু দিতে পারতেন, তাঁকে কীভাবে ইতিহাসের এক অন্ধকার গহ্বরে ‘কয়েদি নম্বর ৬৫০’ বানিয়ে ছুড়ে ফেলা হলো, সেই গল্প মেনে নেওয়া কঠিন। 

পরিশেষে কিছু বই পড়ে শেষ করা যায়, আর কিছু বই পড়া শেষ হলেও পাঠককে তাড়া করে বেড়ায়। এটি সেই দ্বিতীয় দলের বই। হয়তো সাহিত্যিক বিচারে বা রচনার জৌলুসে এটি কোনো কালজয়ী বই নয়, খুব সাধারণ একটি বই। কিন্তু বইটির ছত্রে ছত্রে যার দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে—সেই নামটির ভার এতটাই যে, তা আপনাকে মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দেবে।

বই পরিচিতি—
বইয়ের নাম: ড. আফিয়া সিদ্দিকী: অপ্রকাশিত সত্য
লেখক: সাইয়েদ আবদুল্লাহ আল আমিন
প্রকাশনী : কালান্তর প্রকাশনী
পৃষ্ঠা: ১o৪
মূল্য: ১৪০ ৳

আমার সম্পর্কে

আমি ছফওয়ান আল মুসাইব, একজন 3D আর্টিস্ট, ভিডিও এডিটর। 3D আর্টের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই আমি আমার ক্যারিয়ার শুরু করি, এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের দক্ষতা গড়ে তুলেছি। পেশাগত জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি আমি গল্প লেখা এবং ভ্রমণে দারুণ আগ্রহী। শখের বসে মাঝে মাঝে হাতে কলম তুলে নিই এবং আমার মনের ভাবনা ও অনুভূতিগুলোকে শব্দে রূপ দিই। আমার লেখা গল্পগুলো বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে, যা অনেক পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

জনপ্রিয় পোস্ট

সাম্প্রতিক পোস্ট