প্রহেলিকা

প্রহেলিকা

মাঝে মাঝে আমাদের রিডিং লিস্টে এমন কিছু বইয়ের দরকার হয়, যেগুলো ‘ভারী ভোজ’ নয়, বরং ‘বিকেলের নাস্তা’র মতো। খুব বেশি চিন্তাভাবনা ছাড়াই গপগপ করে গিলে ফেলা যায়। নাজিম উদ দৌলার ‘প্রহেলিকা’ বইটা আমার কাছে ঠিক তেমনই একটা অভিজ্ঞতার, যা অনেকটা হাইওয়েতে গাড়ি চালানোর মতো—প্রচণ্ড গতি, কোনো ট্রাফিক নেই, একদম গড়গড় করে শেষ। এক বসায় পড়ে ফেলার জন্য এর চেয়ে আদর্শ বই আর হতেই পারে না। 

কিন্তু সমস্যা হলো, হাইস্পিডে গাড়ি চালালে যেমন রাস্তার আশেপাশের অনেক সৌন্দর্য মিস হয়ে যায়, এই বইটাতেও ঠিক তাই হয়েছে। গল্পটা আপনাকে দৌড়াতে বাধ্য করবে ঠিকই, কিন্তু দৌড় শেষে যখন থামবেন, তখন মনে হবে—রাস্তাটা বোধহয় আরেকটু মসৃণ হতে পারত, আর কিছু কিছু জায়গায় গর্ত না থাকলে যাত্রাটা হতে পারত পারফেক্ট।

কাহিনি সংক্ষেপ;

ঢাকা শহরের বুকে নেমে এসেছে এক অমানবিক ত্রাস। একজন সাইকোপ্যাথ কিলার রাতের আঁধারে একের পর এক খুন করে চলেছে অসহায় পথশিশুদের। খুন করার ধরনটা এতটাই নৃশংস যে, ভিকটিমদের চেহারা চেনারও উপায় থাকছে না—ইট বা পাথর দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হচ্ছে মাথা।

পুলিশ প্রশাসন যখন দিশেহারা, তখন এই জট খোলার দায়িত্ব পড়ে ডিবি’র জাঁদরেল অফিসার এএসপি মনসুর হালিমের কাঁধে। মজার ব্যাপার হলো, এই সিরিয়াস পুলিশ অফিসারটি একসময় স্বপ্ন দেখতেন স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান হওয়ার! কিন্তু ভাগ্যের ফেরে এখন তাকেই সামলাতে হচ্ছে শহরের সবচেয়ে বীভৎস কেস। তদন্ত করতে গিয়ে মনসুর হালিম আবিষ্কার করেন এক হাড়হিম করা তথ্য। খুনি কোনো সাধারণ পরিকল্পনা করছে না, বরং হুবহু অনুকরণ করছে দেশের বিখ্যাত থ্রিলার লেখক নিয়াজ আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘গাল্লি বয়’-এর কাহিনি!

বাস্তবের খুন আর বইয়ের পাতার কাল্পনিক খুনের এই অদ্ভুত মিল পুলিশকে ধাঁধায় ফেলে দেয়। লেখক নিয়াজ কি তবে নিজেই এই খুনের নেপথ্যে? নাকি তাকে ফাঁসানো হচ্ছে? এর মধ্যেই উদয় হয় ‘প্রহেলিকা’ নামের এক রহস্যময় অনলাইন আইডেন্টিটি, যে কি না লেখককে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে লেখকের বাড়িতে উদয় হয় সন্দেহজনক এক গৃহকর্মী। সব মিলিয়ে, তদন্তের প্রতিটি মোড়ে অপেক্ষা করছে নতুন প্রশ্ন। কে এই প্রহেলিকা? আর এই খুনের মিছিল থামবে কোথায়?

পাঠ প্রতিক্রিয়া;

বইয়ের শুরুতে কিডন্যাপিং আর মুখোশ পরা আগন্তুকের দৃশ্যটা বেশ গা ছমছমে। পড়ার সময় বারবার আমার তামিল মুভি Ratsasan-এর কথা মনে পড়ছিল। যারা ওই মুভিটা দেখেছেন, তারা হয়তো খুনির পেছনের গল্পের সাথে কিছুটা মিল খুঁজে পাবেন। এই সিনেম্যাটিক ফ্লেভারটা বেশ উপভোগ্য।

তবে বইটা শেষ করে আমার প্রথম রিয়েকশন ছিল—‘‘কী হলো এটা? শেষ?’’ কারণ বইটা পড়তে আমার সময় লেগেছে মাত্র দেড়-দুই ঘণ্টা। কোনো বাড়তি মেদ নেই, একদম কাট-টু-কাট এগিয়েছে কাহিনী।

গল্পের হিরো, ডিবি অফিসার মনসুর হালিমকে নিয়ে আমার এক্সপেক্টেশন ছিল আকাশচুম্বী। লেখক তাকে ‘জাঁদরেল’, ‘বিচক্ষণ’ বলে পরিচয় করিয়ে দিলেও, পুরো গল্পে ভদ্রলোককে আমার বেশ অলস আর কনফিউজড মনে হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, কেস সলভ করার আসল ক্রেডিট কিন্তু তার সহকারী ঈশিতা আর কনস্টেবল নাহিদের প্রাপ্য। মনসুর যেন পুরো ঘটনায় একজন প্যাসেঞ্জার, যাকে গল্প টেনেহিঁচড়ে ক্লাইম্যাক্সে নিয়ে গেছে। একজন মেইন লিড যদি তদন্তের চেয়ে বোকামি বেশি করে, তখন থ্রিলারের মজাটাই মাটি হয়ে যায়।  

তবে গল্পের প্লটটা দুর্দান্ত ছিল—বিখ্যাত বইয়ের কাহিনি নকল করে বাস্তবে খুন! আইডিয়াটা শুনেই নড়েচড়ে বসেছিলাম। কিন্তু এক্সিকিউশনে গিয়েই যেন তালটা কেটে গেল। পড়তে গিয়ে বেশ কয়েকবারই ভ্রু কুঁচকে ফেলতে হয়েছে। 

সবচেয়ে অদ্ভুত লেগেছে গল্পের সেই ফ্যানগার্ল মোমেন্টটা। লেখকের লেখার প্রেমে পড়ে, তার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য বড়লোকের মেয়ে ছদ্মবেশে তার বাড়িতে কাজের বুয়া হয়ে ঢুকে পড়েছে—এটা কি এই যুগে বসে বিশ্বাসযোগ্য? এটা পড়তে গিয়ে আমার মনে হচ্ছিল কোনো বাংলা সিনেমার মেলোড্রামা দেখছি, যা বাস্তবতার সাথে একদমই বেমানান।

একটা সাইকো থ্রিলারের প্রাণ হলো তার ভিলেন বা কিলার। অথচ এখানে কিলারের মনের ভেতরটা উঁকি দেওয়ার সুযোগই নেই পাঠকের। লেখকের ফোকাস কিলারের চেয়ে বেশি ছিল লেখক নিয়াজ আহমেদের ওপর। আর সবচেয়ে বড় খটকা লেগেছে ক্লাইম্যাক্সে—একজন ভয়ানক সিরিয়াল কিলার এত সহজে, সুড়সুড় করে সব দোষ স্বীকার করে নিল? এই জায়গাটা বড্ড বেশি ‘বেখাপ্পা’ লেগেছে।

আপনি যদি নিয়মিত থ্রিলার পাঠক হন, তবে বইয়ের মাঝপথেই বুঝে যাবেন খুনি কে। টুইস্টগুলোতে সেই চমকে দেওয়ার মতো বারুদ ছিল না। মনে হয়েছে, লেখক রহস্য জমানোর চেয়ে গল্পটা দ্রুত শেষ করার দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। শেষটা এতটাই তাড়াহুড়ো করে টানা হয়েছে যে, মনে হলো লেখক নিজেই যেন গল্পটা শেষ করতে পেরে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন!

শেষ কথা;

নাজিম উদ দৌলার লেখার হাত ভালো, গল্প বলার ভঙ্গিটা সাবলীল। সব মিলিয়ে, ‘প্রহেলিকা’ আমার কাছে একটা ‘মিশ্র অনুভূতি’। এটাকে একটা পূর্ণ থ্রিলার না বলে, একটা ‘উইকএন্ড টাইম পাস’ বলাই ভালো। তবে নতুন পাঠকদের জন্য বা যারা থ্রিলার জগতে মাত্র পা রাখছেন, তাদের জন্য এটি ভালো একটা এন্ট্রি হতে পারে। কিন্তু বই পড়ে যদি আপনি ভাবতে চান, চরিত্রের মনের গভীরে ডুব দিতে চান—তবে এই বই আপনার তৃষ্ণা মেটাবে না, বরং অতৃপ্তিই বাড়াবে।

বই পরিচিতি—
বইয়ের নাম: প্রহেলিকা
লেখক: নাজিম উদ দৌলা
প্রকাশনী : প্রিমিয়াম পাবলিকেশন্স
পৃষ্ঠা: ১২৬
মূল্য: ১৭৫৳ (গায়ের রেট) 

 

আমার সম্পর্কে

আমি ছফওয়ান আল মুসাইব, একজন 3D আর্টিস্ট, ভিডিও এডিটর। 3D আর্টের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই আমি আমার ক্যারিয়ার শুরু করি, এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের দক্ষতা গড়ে তুলেছি। পেশাগত জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি আমি গল্প লেখা এবং ভ্রমণে দারুণ আগ্রহী। শখের বসে মাঝে মাঝে হাতে কলম তুলে নিই এবং আমার মনের ভাবনা ও অনুভূতিগুলোকে শব্দে রূপ দিই। আমার লেখা গল্পগুলো বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে, যা অনেক পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

জনপ্রিয় পোস্ট

সাম্প্রতিক পোস্ট