একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি

একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি

আদির বিয়ের তোড়জোড় চলছে। পাত্রী, তার ছোটবোন অনুর বান্ধবী—রিতু।  আর অনুর ভূমিকাই এতে প্রধান। পাত্রী দেখতে যাওয়ার আগের দিন মধ্যরাতে হঠাৎ আদির ঘুম ভেঙে যায়, তার বোন অনুকে নিয়ে একটা খারাপ স্বপ্ন দেখে। ‘ভাইয়া আমার অনেক বিপদ! আমার কিছু হয়ে গেলে তোকে কে দেখবে!’ মধ্যরাতে এমন স্বপ্ন দেখে  আদির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে যায়। 

পরেরদিন পাত্রী দেখতে গিয়ে বিরাট ঝামেলা হয়ে যায়। ঝামেলাটা হচ্ছে, আদির মামা মোফাজ্জল হোসেন চশমা হারিয়ে ফেলে। এটা নিয়ে সেখানে এক বিরাট কাহিনী ঘটে যায়। মোফাজ্জল হোসেন ভোজন রসিক মানুষ। পোলাও-বিরানিতে তার বেমালুম আগ্রহ। কিন্তু আগ্রহ থাকা সত্বেও, শুধুমাত্র চোখে চশমা না থাকার কারণে পোলাও-বিরানির পরিবর্তে প্লেতে ভাত নিয়ে ফেলে। চোখে কম দেখার কারণে ভুলটা হয়েছে, আদি সেটা বুঝতে পারে এবং পরিবর্তন করে তাকে নতুন প্লেট দেয়। কিন্তু দ্বিতীয়বারও ভুল করে বসে মোফাজ্জল হোসেন। আর এটা নিয়ে পাত্রীর বড় চাচা মোফাজ্জল হোসেনের সাথে বেজায় রসিকতা করতে থাকে। 

পাত্রী দেখা শেষে বাসায় যাওয়ার পথে অনু আদির কাছে তার সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে, আদি এস্তেখারার জন্য দু’দিনের সময় নেয়। দুইদিন পরে আদির পক্ষ থেকে হ্যাঁ বাচক সিদ্ধান্ত পাওয়ার পরে অনু এবং তার মামা পাত্রীর বাসায় যায় বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করতে। তবে যাওয়ার পথে মোফাজ্জল হোসেনকে অনু তার রূপবতী উস্তাযার সাথে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কারণ, তার মামা মোফাজ্জল হোসেন নীলিমা নামের এক বিশ্বাসঘাতক স্ত্রীর দ্বারা সবকিছু হারিয়ে দিশেহারা। সম্পদ ও স্ত্রীকে হারিয়ে সে আসলে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল, যিনি এখনো নীলিমার জন্য আকুলতা প্রকাশ করে। তাই এই সংকটময় মুহূর্তে অনু তার মামার জীবনকে স্বাভাবিক করতে এই প্রস্তাব। মোফাজ্জল হোসেন প্রথম এতে রাজি না হলেও, কিছুক্ষণ পর রাজি হয়ে যায়। দুইটা বিয়ে পাশা-পাশি, অনুর চেহারায় আনন্দে ঢেউ খেলে যায়। কিন্তু তার এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।  

পাত্রীর বাসায় গিয়ে দেখে পাত্রী বাসায় নাই। বাড়িওয়ালি সাগর জাহানের সাথে হাসপাতালে গিয়েছে। তার ছেলে দুই দিন আগে বিদেশ থেকে এসেছে। এসেই এক্সিডেন্ট করে হাত-পা ভেঙ্গে হাসপাতলে ভর্তি। প্রিয় বান্ধবীকে এমন একটা দিনে বাড়িতে না পেয়ে অনু খুবই মর্মাহত হয়। হঠাৎ তখন সে লক্ষ্য করে, আরো একজন বাসায় নেই— রিতুর বাবা আবির সাহেব। অনুর কাছে সম্পূর্ণ বিষয়টা খটকা লাগে। কারন সে তো বলে-কয়েই এসেছে। সুতরাং তাদের অনুপস্থিতি, তার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়।

ওদিকে সাগর জাহান রিতুকে হাসপাতালের কথা বলে বহুতল ভবনের একটা রেস্তোরাঁয় নিয়ে যায়। সেখানে রিতুকে সাগর জাহানের একমাত্র ছেলে সানির সাথে জোরপূর্বক বিবাহ দেওয়ার সকল বন্দোবস্ত করে। পরে রেস্তোরাঁর ম্যানেজার শফিক সাহেবের সাহায্যে রিতু সুস্থভাবে বাসায় ফিরতে সক্ষম হয়। 

বিয়ের দুই দিন আগে অনুর মোবাইল একটা মেসেজ আসে, ‘আমি সন্ধ্যা রায়, একজন নওমুসলিমা। শুনেছি আপনাদের একটা সংগঠন আছে। সেখান থেকে অনেকেই দিন শিখছে। আমিও কিছু শিখতে চাই এবং আপনার সাথে দেখা করতে চাই!’ আদির বিয়ের তোড়জোড় সব অনুরই করতে হচ্ছে। তাই ব্যস্ততার কারণে প্রথমে দেখা করতে রাজি না হলেও, সন্ধ্যা রায়ের বারবার পীড়াপীড়িতে অনু পরের দিন তার উস্তাযা হাবিবাকে নিয়ে সন্ধ্যা রায়ের সাথে দেখা করতে যায়। 

ওদিকে আদি অফিসের জরুরী কাজ নিয়ে ব্যস্ত। বিয়ের জন্য এক সপ্তাহের ছুটি নিতে হবে। হাতে অনেক কাজ। তাছাড়া আজকে একটু তাড়াতাড়ি বেরুতে হবে। তাকে নিয়ে অনু কেনাকাটা করতে যাবে। এমন সময় ফয়সাল (অনুর স্বামী) আদিকে ফোন করে জানায়, ‘‘অনু সেই সকালে বাসা থেকে কলেজের উদ্দেশ্যে গিয়েছিল, তবে কলেজ শেষে এখনো বাসায় ফেরেনি। তার ফোনও বন্ধ।’’ ফয়সালের কথা শুনে আদির প্রথমেই সন্দেহ হলো, অনুর কলেজ টিচার মানিক স্যারের (একজন ক্ষমতাসীন দলের নেতা) প্রতি। এর যথেষ্ট কারণও আছে। মাস দু’য়েক আগে একদিন অনু একটু আগে-ভাগেই কলেজে গিয়েছিল। যেই সে গেট দিয়ে ঢুকতে যাবে তখনই একটা কিশোরী মেয়ের আর্তচিৎকার শুনতে পায়—‘‘এখানে কেউ আছেন? আমাকে বাঁচান প্লিজ!’’ সেদিন অনুর কারণেই মেয়েটা বিপদ থেকে বেঁচে যায় এবং মানিক স্যারকে পুরো কলেজের ছাত্রী এবং শিক্ষকদের সামনে অপমানিত হতে হয়। এই ঘটনার পর মানিক স্যারের লোকজন অনুকে নানাভাবে ডিস্টার্ব এবং ভয় দেখাতে থাকে। সুতরাং মানিক স্যারের ঘটনার সঙ্গে অনুর নিখোঁজ হওয়ার কারণটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই আদি সোজা অনুর কলেজে গেল। তবে সেখানে গিয়ে কোন লাভ হলো না। কারণ কলেজ অনেকক্ষণ আগেই ছুটি হয়ে গিয়েছে।  আদি  দারোয়ানের কাছ থেকে মানিক স্যারের বাসার ঠিকানা নিয়ে, মানিক স্যারের বাসায় গেল। কিন্তু মানিক স্যারকে পাওয়া গেল না, এমনকি তার নাম্বারও বন্ধ। আদির সন্দেহ বেড়ে গেল।

আদি রিতুকে ফোন দিল, অনু কোন কারণে তাদের বাসায় গিয়েছে কিনা জানার জন্য। তবে রিতুকে ফোন দেওয়ার পরে নতুন একটা ঘটনার সূত্রপাত ঘটলো। রিতু জানালো, ‘‘অনু একদিন কলেজের ক্যান্টিনের জয়িতা দিদির সিঙ্গারা খেয়ে হড়হড় করে বমি করেছিল। কারণ সিঙ্গারাটা নাকি বিশেষভাবে কড়া করে অনুর জন্যই ভাজা হয়েছিল। তবে জয়িতা দিদি হিজাব পরা মেয়েদের দুই চোখেও দেখতে পারে না। তার চেয়েও অদ্ভুত ব্যাপার হলো, জয়িতা দিদি ওই ঘটনার পর এক সপ্তাহ কলেজে আসেনি।’’ আদি রিতুর থেকে ক্যান্টিনের কর্মচারী জয়িতা দিদির বাসার ঠিকানা নিয়ে হাজারীবাগ তার বাসায় যান। তবে সেখানে গিয়ে আদি আরও আশ্চর্য হয়ে যায় এটা জেনে যে, কলেজের সেই অপরাধী মানিক স্যার রিতুদের আত্মীয়। এমনকি মানিক স্যারের অপরাধের সেই ইস্যু নিয়ে অনু এবং রিতু মধ্যে ঝগড়াও হয়েছিল।

এরই মধ্যে আদির মোবাইলে অপরিচিত একটা নাম্বার থেকে মেসেজ আসে— আমি সন্ধ্যা রায়। আপনার বোনকে পাওয়া গেছে। নিচের এই ঠিকানায় চলে আসুন_ হোটেল মেহমান, রুম নং ১১৭ সায়েদাবাদ, বাসস্ট্যান্ড। 
আদি সাত-পাঁচ না ভেবে সোজা সায়দাবাদ চলে যায়। কিন্তু যাওয়ার পরে বুঝতে পারে সে নিজেও ফেঁসে গেছে এবং তাকে অজ্ঞান করে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘুম ভাঙতেই আদি শুনতে পায় পাশের রুম থেকে চেঁচামেচির শব্দ। সন্ধ্যা রায় ফোনে কাকে যেন চিৎকার করে বলছে, ‘‘আমাকে পেমেন্ট করার কথা ছিল তিরিশ হাজার। কিন্তু আমি পেয়েছি মাত্র দশ হাজার। আমার বাকি টাকা পরিশোধ করতে বলেন। নইলে কিন্তু আমি সব ফাঁস করে দিবো।’’ ঘটনাচক্রে আদি একপর্যায়ে জানতে পারে, সে আসল সন্ধা রায় নয়। তার নাম হলো সায়মা। গত দুই বছর ধরে সে তার স্বামী খালিদকে খুঁজতেছে। দুই বছর আগে খালিদ চাকরির ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য ঢাকায় আসে। ইন্টারভিউতে সে পাস করে যায়। ফোন করে প্রথমে সায়মাকে জানায় খবরটা। এরপর থেকে তার আর কোন খোঁজ নেই। তাকে খুঁজে পেতেই সায়মা এখন বিভিন্ন ধোঁকাবাজি-অপরাধের সাথে জড়িত। 

তবে আদির সৎ চরিত্র এবং বোনের প্রতি ভাইয়ের ভালোবাসা দেখে সায়মা আদিকে মুক্ত করে দেয় এবং সেখান থেকে দ্রুত চলে যেতে বলে। তবে যাওয়ার সময় সায়মা, আসল সন্ধ্যা রায়ের নাম্বারটা দেয় অনুকে খুঁজে পেতে। আদি সায়মার থেকে সন্ধ্যা রায়ের নাম্বারটা নিয়ে তার ঘনিষ্ঠ এক ডিবি অফিসার, রিয়াজ রহমানের কাছে দেয়। রিয়াজ রহমান তার অন্যান্য অফিসারদের সাহায্যে নাম্বারটা ট্রেস করে চট্টগ্রাম মহাসড়কের ইলিয়টগঞ্জ নামক এলাকা থেকে অনু এবং তার উস্তাযা হাবিবকে উদ্ধার করে। 

ওদিকে আদি ‘মেহমান হোটেল’ থেকে বের হওয়ার দশ মিনিটের মাথায়, এক লোক দু’জন পুলিশ নিয়ে ১১৭ নম্বর রুমে আসে। আদিকে না পেয়ে লোকটা সায়মাকে খুব মারধর করে। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে সায়মা অসুস্থ হয়ে যায়। অনু এবং উস্তাযা হাবিবকে নিয়ে আদি ইলিয়টগঞ্জ থেকে ফেরার পথে সায়মাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। ডাক্তার সায়মার অবস্থা সিরিয়াস বুঝতে পেরে বিভিন্ন ধরনের টেস্ট করায় এবং আদির কাছে থেকে সম্পূর্ণ ঘটনা শুনে। এরপর রিপোর্ট দেখে বলে, ‘‘রোগীর অবস্থা জেনেই আমি অনেকটাই নিশ্চিত ছিলাম যে, রিপোর্টে আমি এমন কিছুই দেখবো। উনি মারাত্মক ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোমে আক্রান্ত। তীব্র মানসিক আঘাত বা স্ট্রেস থেকে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। আরও আগেই উনার চিকিৎসা নেওয়ার দরকার ছিল। দীর্ঘদিন হতাশার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে উনার হার্টের পেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় অধিকাংশ রোগীই মৃত্যুর মুখে চলে যায় অথবা সুইসাইডের দিকে ধাবিত হয়। ভাগ্য ভালো যে উনি সুইসাইডের দিকে যাননি। তবে উনাকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে হলে ওষুধপত্রের চেয়েও বেশি জরুরি হলো একটা অবলম্বনের ব্যবস্থা করা। অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য কেউ সবসময় পাশে থাকা। সম্ভব হলে উনার হাজব্যান্ডকে খুঁজে বের করুন। অথবা সার্বক্ষণিক সঙ্গে থাকার মতো গভর্নেসের ব্যবস্থা করুন। তবে যেহেতু বয়স কম, সবচেয়ে ভালো হয় সুপাত্র দেখে উনাকে বিয়ে করিয়ে দিতে পারলে। তাহলে দীর্ঘদিনের এই ট্রমা থেকে বের হওয়া উনার জন্য সহজ হবে। নয়তো অবস্থা আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। বাইচান্স যদি অবস্থাটা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের দিকে চলে যায়, তাহলে উনার মৃত্যুও হতে পারে!” 

ডাক্তারের কাছ থেকে সায়মার এতটা অবনতির কথা শুনে সবাই খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ে। রিতুর মনে সায়মাকে নিয়ে এক আকাশ সমপরিমাণ মায়া জন্ম নেয়। সে সিদ্ধান্ত নেয়— সায়মার স্বামী খালিদকে যদি খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে সায়মা সুস্থ হওয়ার পরে, আদিকে সে বিয়ে না করে সায়মার জন্য উৎসর্গ করে দিবে। এদিকে আদি এবং ডিবি অফিসার রিয়াজ রহমান ও তার লোকজন খালিদকে হন্য হয়ে বিভিন্ন জায়গায় খুঁজতে থাকে। এরই মধ্যে ডিবি অফিসার অনুকে কিডন্যাপ করার মূল পরিকল্পনাকারীদেরকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। পরিকল্পনাকারীদের দলের প্রধান হল মানিক স্যার।  

মানিক স্যার গ্রেফতার হওয়ায় আদির উপর আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়। সে আদিকে সাইজ করার জন্য, জেলে বসেই তার বিশ্বস্ত লোক চিহ্নিত সন্ত্রাসী কানা জুয়েলকে অর্ডার দেয়। কারণ মানিক স্যার চায় একই ঢিলে দুই পাখি মারতে। 
দু’দিন পর হাসপাতাল থেকে সায়মাকে রিলিজ দিলে, তার একটা প্রাইভেট কার ভাড়া করে রিতুদের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এদিকে কানা জুয়েল মানিক স্যারের কথা মত আদিকে সাইজ করার জন্য একটা ট্রাক ভাড়া করে। প্রতিমধ্যে সুযোগ বুঝে  কানা জুয়েল সেই ট্রাক দিয়ে প্রাইভেটকারকে ধাক্কা মারে। প্রাইভেটকার দুমড়ে-মুচড়ে রাস্তার পাশে গিয়ে পড়ে। সায়মা এবং রিতু খুবই গুরুতর আহত হয়। বাকিরা কম বেশি আহত হয়। হাসপাতালে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর সায়মা মারা যায়। তবে মৃত্যুর আগে নার্সের মাধ্যমে আদির জন্য একটা চিরকুট লিখে যায়।

অনুভূতিঃ

মাহিন মাহমুদ— যাকে নিয়ে নতুন করে বলার আর অপেক্ষা রাখে না। তার প্রতিটি লেখার ঘটনাগুলোর গতি এমন যে, পাঠকে বারবার নিঃশ্বাস আটকে রাখে। তাকে প্রথম পড়ি আমি সেই হেফজখানায় থাকতে। ঘুমের ছুটি হওয়ার পর ছাত্ররা ঘুমিয়ে পড়ত। আর আমি হুজুরের ঘুমের অপেক্ষায় থাকতাম— হুজুর কখন ঘুমাবে! যখন মোটামুটি নিশ্চিত হতাম হুজুর ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন কাঁথা মোড়া দিয়ে গ্যাস লাইটারের আলো জ্বালিয়ে (তখন গ্যাস লাইটারের পিছন দিকে ছোট্ট বাতি এবং তিনটা ব্যাটারি থাকতো) প্রাসাদপুত্র বইটি পড়তাম। সেই থেকে তার লেখার প্রেমে পড়ি।

তার প্রতিটি লেখার মধ্যেই আমি কেমন যেন একটা ভিন্ন আমেজ খুঁজে পাই। যেখানে অন্যান্য লেখকরা তাদের লেখার মধ্যে হারাম রিলেশন ইত্যাদি জড়িয়ে ফেলে, সেখানে মাহিন মাহমুদ সাহেব বিবাহপূর্বের সম্পর্ক যে হারাম, এই বিষয়ে গল্পের মাধ্যমে খুবই সূক্ষ্ম ভাবে মেসেজ দেওয়ার চেষ্টা করেন। শুধু এই বিষয়ে না, ইসলামের আরো বিভিন্ন বিষয় তিনি তার প্রতিটি লেখার মধ্যে খুবই সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। যেখানে উপন্যাস বলতে অনেক লেখক শুধু কিচ্ছা কাহিনী বোঝে। বিপরীতে তার প্রতিটি লেখাই থ্রিলার, রোমান্স, সমাজ, রাজনীতি, মানবিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, গুম-খুন ইত্যাদির সমন্বয়ে তৈরি হয়। যা একটা ভিন্ন নেশা তৈরি করে।  

তবুও, এত কিছু ভালো লাগার পরও কিছু জায়গায় একটু হাঁপিয়ে উঠতে হয়। কখনো কখনো বইটা বন্ধ করে বসতে হয়—মাথায় ঘুরতে থাকে অজস্র প্রশ্ন। যেগুলোর উত্তর খুঁজতে মন চলে যায় অন্য এক জগতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত? শেষ পর্যন্ত সেই উত্তরগুলো আর ধরা দেয় না। বুঝে উঠতে পারি না—এটা কি লেখকের অক্ষমতা, নাকি সচেতন কৌশল? হয়তো তিনি চেয়েই এমন করেন, যেন পাঠক রহস্যের ভেতর ডুবে থাকে, পড়ার প্রতি আরও মনোযোগী হয়ে ওঠে। তার লিখিত অধিকাংশ বইয়ের মধ্যেই আমার মনে এমন অনেক প্রশ্ন জেগেছে, যেটার উত্তর আমি শেষ পর্যন্ত সেই বইয়ের মধ্যে খুঁজে পাইনি। যেমন এই ‘‘একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি’’ বইটার কথাই বলি— 

  • বইটার প্রথম দিকে দেখা যায় আদি তার চাকরি জীবন নিয়ে মহাব্যস্ত। কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন রয়ে যায়— আদি হঠাৎ চাকরি পেল কোথায়, কিভাবে? যেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ডে দেখা যায়, আদি তার বাবার হারাম টাকায় উপার্জনে তৈরি আলিশান বাড়ি ছেড়ে বেকার অবস্থায় নিম্নমানের একটা ম্যাচে জীবন-যাপন করতেছে। সেখানে হঠাৎ এই খন্ডে এসে কোন ভূমিকা ছাড়াই আদির  চাকরির বিষয়টা একটু অন্যরকম লাগতেছে। যদিও আদি শিক্ষিত ছেলে, তবুও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট হিসেবে একটা চাকরি পাওয়া আর সোনার হরিণ পাওয়া দুটোই সমান কথা। সুতরাং ভুমিকা ছাড়া চাকরির বিষয়টা নিয়ে আসা অন্যরকম মনে হচ্ছে।
  • অনুর মামা মোফাজ্জল হোসেনের বিয়ের কি হলো? উস্তাযা হাবিবার পক্ষ থেকে না-বাচক শোনার পরে অনু তার মামার বিয়ের বিষয়টা একেবারেই বাদ দিয়ে দিছে নাকি সে যেহেতু দায়িত্ব নিছে, তাই এটার শেষ পর্যন্ত দেখবে— তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ নাই!
  • আমরা দ্বিতীয় খন্ডের শেষে এসে দেখতে পাই, বিয়েতে মত না থাকার পরেও অনুকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিয়ের দিন অনুর বাবা অ্যারেস্ট হয়ে যাওয়ার কারণে বিয়ের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে অনু খুবই খুশি— কারণ তার অপছন্দের ছেলেকে বিয়ে করা লাগতেছে না। কিন্তু তৃতীয় খন্ডে এসেই আমরা অনুর দাম্পত্য জীবন দেখতে পাই। যেহেতু অনুও এই উপন্যাসের মূল চরিত্র গুলোর মধ্যে একটা— সেখানে কোন ভূমিকা ছাড়াই ফয়সালের সাথে তার দাম্পত্য জীবন। বিষয়টা একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে।
  • বাড়িওয়ালি সাগর জাহান যে, রিতুকে তার ছেলের সাথে জোরপূর্বক বিবাহ দিতে চেয়েছিল— সেই সাগর জাহান এবং তার ছেলে সানি গল্পের মধ্যে থেকে কোথায় হারিয়ে গেল? রিতুর সাথে সাগর জাহান তার ছেলেকে বিবাহ দিতে না পেরে, হোটেলের ম্যানেজার শফিক সাহেব এবং কাজী সাহেবকে যে হুমকি দিল, সেটারই বা কি হলো? যেহেতু সাগর জাহান ও ছেলে সানি উক্ত রেস্তোরাঁর মালিকপক্ষ এবং ক্ষমতাসীন দলের বড় বড় নেতাদের সাথে তাদের ওঠা বসা।
  • মানিক স্যার কি প্রকৃত অর্থে রিতুদের ফ্যামিলির সাথে আত্মীয়তার সূত্রে বাধা নাকি জয়িতা দিদি আদিকে ভুল-ভাল বুঝিয়ে সেখান থেকে বিদায় করেছে— এটাও অস্পষ্ট নয়।
  •  সন্ধ্যা রায় কে? তার সাথে মানিক স্যারের যোগসূত্র কি?
  • অনুকে কিডন্যাপ করা হয়েছিল ভয় দেখানোর জন্য নাকি ক্ষতি করার জন্য— তা স্পষ্ট নয়। যদি ভয় দেখানোর জন্য হয়, তাহলে এত আয়োজন করার কোন দরকার ছিল না। আর যদি ক্ষতি করার জন্য হয়, তাহলে মাঝ রাস্তায় গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর, গাড়িসহ তাদেরকে ফেলে রেখে কিডন্যাপারদের চলে যাওয়ার ব্যাপারটা একেবারে নাটকীয় এবং হাস্যকর। কোন কিডন্যাপার কখনোই এ ধরনের কাজ করবে না।
  • যে বয়স্ক ব্যক্তি সায়মাকে বিভিন্ন অপরাধ মূলক কাজে ব্যবহার করত, সে আসলে কে?
  • গল্পের প্রথম দিকে মেইন পয়েন্টে থাকে আদি এবং রিতুর বিয়ে। যদিও এটা পরে আস্তে আস্তে সরে গিয়ে দাঁড়ায় খালিদের নিখোঁজ হওয়ার উপর। কিন্তু এই আদি এবং রিতুর  বিয়ের শেষ পর্যন্ত কি হয়?
  • আদির সাথে যেহেতু ডিবি অফিসার রিয়াজ রহমানের ভালো একটা সম্পর্ক, সুতরাং বলা বাহুল্য যে, হাসপাতাল থেকে রিলিজ হওয়ার পরে বাসায় যাওয়ার পথে গাড়ি এক্সিডেন্ট, সায়মার মৃত্যু— এসব জায়গায় ডিবি অফিসারের কি ভূমিকা ছিল? যেহেতু সায়মার বিষয়টা এবং খালিদের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটা ইতিমধ্যে ডিবি অফিসারসহ আরো অনেক অফিসার জেনে গিয়েছে। এমন মুহূর্তে সায়মার মৃত্যু, পরবর্তীতে প্রশাসনের কি ভূমিকা ছিল? যদিও এটা একেবারে লাস্ট স্টেপ, তবুও পাঠক হিসেবে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াই।
  • ডেইজি চৌধুরীর শেষ পরিণতি কি, নাকি সে এভাবেই অপরাধ জগতে রাজ্য বিস্তার করতে থাকবে? 

এমন অনেক প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে, একটার পর একটা। মনে হয়—লেখক হয়তো ইচ্ছে করেই এসব প্রশ্নের উত্তর দেন না। যেন আমরা, পাঠকরা, নিজেরা ভাবতে শিখি, নিজের মতো করে ব্যাখ্যা খুঁজে পাই। এটাই তো তার লেখার আসল জাদু—ভাবতে বাধ্য করা, প্রশ্ন করতে শেখানো। তবুও একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে উত্তর না পাওয়ার সেই হালকা অস্বস্তিটা থেকে যায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো—এই অস্বস্তিই আবার পরের বইয়ের জন্য কৌতূহলটা আরও বাড়িয়ে দেয়, যেন সে চাইলেও আমাদের শেষ পর্যন্ত শেষ করতে দেয় না।

বইয়ের নাম: একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি
লেখক: মাহিন মাহমুদ
প্রকাশনী: মাকতাবাতুল হাসান
মূল্য: ২২০ ৳

বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে আপনার নিকটস্থ লাইব্রেরিতে খোঁজ নিতে পারেন। এছাড়া, দেশের অন্যতম অনলাইন বুকশপ রকমারি, ওয়াফিলাইফ-সহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও বইটি পাওয়া যাচ্ছে। সর্বশেষ অফার সম্পর্কে জানতে বা সংগ্রহ করতে লিংকে ক্লিক করুন: https://www.rokomari.com/book/510440/ekti-harano-biggopti 

 

আমার সম্পর্কে

আমি ছফওয়ান আল মুসাইব, একজন 3D আর্টিস্ট, ভিডিও এডিটর। 3D আর্টের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই আমি আমার ক্যারিয়ার শুরু করি, এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের দক্ষতা গড়ে তুলেছি। পেশাগত জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি আমি গল্প লেখা এবং ভ্রমণে দারুণ আগ্রহী। শখের বসে মাঝে মাঝে হাতে কলম তুলে নিই এবং আমার মনের ভাবনা ও অনুভূতিগুলোকে শব্দে রূপ দিই। আমার লেখা গল্পগুলো বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে, যা অনেক পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

জনপ্রিয় পোস্ট

সাম্প্রতিক পোস্ট