আসমান

আসমান

লতিফুল ইসলাম শিবলী—নামটা শুনলেই আমাদের জেনারেশনের অনেকের মাথায় সবার আগে আসে সেই তুমুল জনপ্রিয় সব গানের কথা। ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’, ‘জেল থেকে বলছি’ কিংবা ‘তুমি আমার প্রথম সকাল’—এই সব কালজয়ী গান। কিন্তু তিনি যখন লিরিসিস্টের খোলস ছেড়ে ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠেন, তখন তিনি আসলে কী জাদু দেখাতে পারেন, সেটা “আসমান” না পড়লে বোঝা মুশকিল।
আজ এই বইটা নিয়েই আমার কিছু ব্যক্তিগত অনুভূতি আর অভিজ্ঞতা শেয়ার করব। তবে এটা কোনো কাঠখোট্টা রিভিউ নয়, বরং একজন পাঠকের ডায়েরি বলতে পারেন।

শুরুর কথা;

নব্বইয়ের দশক। ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলের দশম শ্রেণির ওমার রিজওয়ান ও ধানমন্ডি গার্লস স্কুলের নবম শ্রেণির লামিয়ার পরিচয় হয় এক বিতর্ক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। আর এই পরিচয় গড়িয়ে রূপ নেয় প্রেমে। ওমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার এক বছর পর লামিয়াও ভর্তি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। ক্যাম্পাসে নামকরা জুটি তারা। কিন্তু ওমারকে অবাক করে দিয়ে লামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাডার এনায়েতের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দেয়। ভালোবাসার মানুষ ছেড়ে চলে যাওয়া—ওমারের জীবনটা এলোমেলো হয়ে যায়। ড্রাগস, রক মিউজিক আর বন্ধু রুশোর সাথে ছন্নছাড়া জীবন—এটাই হয়ে যায় তার নিত্যদিনের রুটিন।

গল্পের মোড় নেয় তখন, যখন ওমরের সাথে পরিচয় হয় ধানমন্ডি আটের জামে মসজিদের বৃদ্ধ ইমাম মাওলানা ইসহাক আব্দুর রহমানের। মানসিক কষ্ট কাটাতে মায়ের পরামর্শে ওমার শরনাপন্ন হয় এই ইমাম সাহেবের কাছে। গতানুগতিক হুজুরদের মতো নন তিনি, বরং একজন আধ্যাত্মিক দার্শনিক। তিনি যুক্তি দিয়ে ওমরকে শেখান, “হৃদয় আল্লাহর ঘর, সেখানে নশ্বর কাউকে বসালে কষ্ট পেতেই হবে।”

ব্যাস! এখান থেকেই শুরু হয় ওমরের এক অবিশ্বাস্য জার্নি। নিজেকে খোঁজার এই যাত্রা তাকে ঢাকা থেকে পাকিস্তান, পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানের রুক্ষ পাহাড়, তালিবান আমল, প্রেম-বিবাহ, যুদ্ধ, নাইন-ইলেভেন, গুয়ানতানামো বে-র অন্ধকার কারাগার—সেখানে দীর্ঘ ১২ বছর বিনা বিচারে জেলে খেটে মুক্তি এবং শেষে আলবেনিয়াতে যাওয়া।

পাঠ প্রতিক্রিয়া;

  • আমার কাছে এই বইয়ের সবচেয়ে ভালো লেগেছে ইমাম চরিত্র এবং তাঁর বলা কথাগুলো। যিনি সব কথা বুঝান যুক্তি দিয়ে। কারণ, অন্ধভাবে কিছু বিশ্বাস করলে তা একসময় না একসময় ভেঙে যায়। তিনি ধর্মকে ভয়ের মোড়কে নয়, বরং ভালোবাসার মোড়কে উপস্থাপন করেছেন। ওমর যখন ডিপ্রেশনে ভুগছিল, তখন তাকে যেভাবে আধ্যাত্মিক হিলিং দেওয়া হয়েছে, সেটা যে কোনো পাঠকের মনে দাগ কাটবে। মনে হবে, কথাগুলো যেন আমার নিজের জন্যই বলা।
  • বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা রয়েছে, ‘আমেরিকার কুখ্যাত কারাগার গুয়ানতানামো থেকে ১২বছর বিনা বিচারে সাজা কাটানোর পর মুক্তি পেয়েছে বাংলাদেশি এক যুবক। তবে নিজ দেশের দরজা তার জন্য বন্ধ। এখন কোথায় যাবে সে?’ যা পুরোপুরিই গল্পের শেষ অংশ— গল্পের প্লট নয়। অনেক পাঠক ফ্ল্যাপ দেখে গল্পের প্লট পছন্দ হলে, বই ক্রয় করে। এক্ষেত্রে এখানে পাঠক আশাহত হতে পারে।
  • গল্পের শুরুটা বেশ চমৎকার। কাহিনী হয়তো প্রথম কয়েক পাতায় ধুমধাম করে জমে ওঠে না, কিন্তু লেখক খুব যত্ন নিয়ে চরিত্রগুলোকে তৈরি করেছেন। যা আপনাকে গল্পের ভেতরে টেনে নেবে। তবে পড়তে গিয়ে গল্পের মাঝখানের কিছু জায়গায় ডিটেইলিং বা বিস্তারিত বর্ণনার খুব অভাব বোধ করেছি। মনে হয়েছে লেখক যেন কিছুটা তাড়াহুড়ো করে শেষের দিকে এগিয়ে গেছেন। বিশেষ করে গল্পের সমাপ্তিটা বড্ড দ্রুত টানা হয়েছে বলে মনে হলো।  
  • বইয়ের মূল সুর যেহেতু আধ্যাত্মিকতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ, সেখানে ওমার আর আসমার মধ্যকার প্রেম বা ঘনিষ্ঠতার দৃশ্যগুলো আমার কাছে একটু অসামঞ্জস্যপূর্ণ লেগেছে। উদ্দেশ্য হয়তো পাঠকের সহানুভূতি আদায় করা, কিন্তু সেটা আরও মার্জিতভাবেও করা যেত। তাছাড়া, আফগানিস্তানের মত দেশের পরহেজগার একটা পরিবার, তাদের মেয়েকে বিবাহের পূর্বে একজন ভিনদেশি যুবকের সাথে ওভাবে মেলামেশার সুযোগ দেবে—এটা বেশ অবাস্তব মনে হয়েছে। এছাড়াও জিহাদ সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা, তালেবান নেতৃত্ব ইত্যাদি বিষয়ে সমালোচনা করা হয়েছে। 
  • গল্পের শেষটা আমার কাছে একটু বেশিই ‘ফিল্মি’ মনে হয়েছে। ওমরের মুক্তি পাওয়া, আলবেনিয়াতে যাওয়া এবং সেখানে হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনকে খুঁজে পাওয়া—এটা বাস্তবতার চেয়ে কল্পনার রঙে একটু বেশি রঙিন মনে হয়েছে। তবে ফিকশন হিসেবে ঠিক আছে।

বইটি আসলে কাদের জন্য?

  • যারা জীবনে হতাশা বা ডিপ্রেশনে ভুগছেন এবং আধ্যাত্মিক শান্তি খুঁজছেন।
  • যারা জিওপলিটিক্স, নাইন-ইলেভেন পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতি এবং আফগান যুদ্ধ সম্পর্কে আগ্রহী।
  • যারা লতিফুল ইসলাম শিবলীর গানের ভক্ত এবং তাঁর চিন্তাধারার সাথে পরিচিত হতে চান।
  • যারা থ্রিলার এবং ইমোশনাল জার্নি—দুটো স্বাদই একসাথে পেতে চান।

লেখক এর সংক্ষিপ্ত জীবনী;

লতিফুল ইসলাম শিবলীর জীবনটা আক্ষরিক অর্থেই সিনেমার গল্পের মতো। জন্ম হয়েছিল পয়লা বৈশাখের এক ভোরে, আর শৈশব কেটেছে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙ্কারে বসে। নব্বইয়ের দশকে রাজনৈতিক হুলিয়া মাথায় নিয়ে নাটোর থেকে ঢাকায় পালিয়ে আসা সেই তরুণই পরে হয়ে ওঠেন বাংলা ব্যান্ড সংগীতের এক কিংবদন্তি গীতিকবি।

আইয়ুব বাচ্চু, জেমস কিংবা সোলসের কালজয়ী সব গান—‘হাসতে দেখো’, ‘জেল থেকে বলছি’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘পলাশী প্রান্তর’—এগুলোর পেছনের জাদুকর তিনি। রক কালচারের ভাষায় তারুণ্যের আবেগ ধরতে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

শুধু কি গান? তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের জনপ্রিয় ফ্যাশন আইকন (সেই বিখ্যাত ঝুঁটিবাঁধা চুল!), মডেল এবং অভিনেতা। ‘রাজকুমারী’ নাটকে মির্জা গালিবের চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও অনেকে ভোলেনি। নাটক, কবিতা, সিনেমার স্ক্রিপ্ট—সব মাধ্যমেই তিনি নিজের ছাপ রেখেছেন। ‘দারবিশ’-এর মতো বেস্টসেলার উপন্যাসের লেখক এই মানুষটি স্বভাবে পুরোদস্তুর বোহেমিয়ান, যাঁর পায়ের ছাপ পড়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে।

শেষ কথা;

বইটা শেষ করার পর আমার একটা কথা বারবার মনে হচ্ছিল—মানুষের জীবন সত্যিই তাকদিরের এক অদ্ভুত খেলা। আমরা যা পরিকল্পনা করি, আর যা ঘটে, তার মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব। কিন্তু সেই দূরত্বের মাঝেই লুকিয়ে থাকে কিছুটা প্রাপ্তি।

তবে সোজা সাপটা বলি—বইটা নিয়ে অনলাইনে যতটা মাতামাতি দেখেছি বা যতটা হাইপ ছিল, আমি ব্যক্তিগতভাবে ততটা মুগ্ধ হতে পারিনি। হয়তো আমার এক্সপেক্টেশন একটু বেশিই ছিল। এর মূল কারণ হতে পারে, আমি আগে থেকেই আফগানিস্তান, নাইন-ইলেভেন বা গুয়ানতানামো বে-র ঘটনা নিয়ে ডজনখানেক বই পড়েছি। ফলে এই বইয়ের ঘটনাপ্রবাহ বা তথ্যের মধ্যে আমি তেমন কোনো নতুনত্ব খুঁজে পাইনি যা আমাকে চমকে দেবে।

কিন্তু—হ্যাঁ, একটা ‘কিন্তু’ আছে। আপনি যদি এই বিষয়গুলো নিয়ে আগে তেমন কিছু না পড়ে থাকেন, অর্থাৎ আফগান যুদ্ধ বা সেই সময়ের জিও-পলিটিক্স সম্পর্কে আপনার ধারণা কম থাকে, তবে ‘আসমান’ আপনাকে হতাশ করবে না। নতুন পাঠক হিসেবে আপনি বেশ ভালোই ধাক্কা খাবেন এবং তৃপ্তি নিয়েই বইটা শেষ করবেন। সেক্ষেত্রে নির্দ্বিধায় বইটা আপনার শেলফে জায়গা পেতেই পারে।

বইয়ের নাম: আসমান
লেখক: লতিফুল ইসলাম শিবলী
প্রকাশনী: কেন্দ্রবিন্দু
মূল্য: ৩২০৳

 

আমার সম্পর্কে

আমি ছফওয়ান আল মুসাইব, একজন 3D আর্টিস্ট, ভিডিও এডিটর। 3D আর্টের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই আমি আমার ক্যারিয়ার শুরু করি, এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের দক্ষতা গড়ে তুলেছি। পেশাগত জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি আমি গল্প লেখা এবং ভ্রমণে দারুণ আগ্রহী। শখের বসে মাঝে মাঝে হাতে কলম তুলে নিই এবং আমার মনের ভাবনা ও অনুভূতিগুলোকে শব্দে রূপ দিই। আমার লেখা গল্পগুলো বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে, যা অনেক পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

জনপ্রিয় পোস্ট

সাম্প্রতিক পোস্ট